জনজীবন বিপর্যস্ত: মুন্সিগঞ্জে লোডশেডিংয়ের রেকর্ড, মধ্যরাত-ভোর-দুপুর একই পরিস্থিতি
1

মুন্সিগঞ্জ, ১১ আগস্ট ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মধ্যরাত, ভোর, সকাল কিংবা দুপুর—সময় যেন কোনো বিষয়ই নয়। মুন্সিগঞ্জে দিনের প্রায় সব সময়ই দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কোথাও দিনে ৭-৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না, আবার কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকার সময় ৫ ঘণ্টায় নেমে আসার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

গত কয়েক দিন ধরে জেলার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এমন পরিস্থিতি চলছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজ। রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘুমাতেও পারছেন না অনেক মানুষ।

২ আগস্ট ‘আমার বিক্রমপুর’-এর ফেসবুক পেজে ২৪ ঘণ্টায় কতক্ষণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে—এমন তথ্য জানতে চাওয়া হলে প্রথম এক ঘণ্টাতেই প্রায় ২১৬টি মন্তব্য আসে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের বাসিন্দারা সেখানে নিজেদের এলাকার লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলে ধরেন।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার পাঁচঘড়িয়াকান্দি এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তাঁরা। কাটাখালি এলাকার আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।

শ্রীনগরের রাঢ়িখাল ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান, তাঁদের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সিরাজদিখানের ইছাপুরা ইউনিয়নের এক বাসিন্দার ভাষ্য, তাঁদের এলাকায় দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। লৌহজংয়ের মৌছা এলাকার এক বাসিন্দাও জানিয়েছেন, সারাদিনে প্রায় ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান তাঁরা।

শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, মুন্সিগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকাতেও একই চিত্র। ইদ্রাকপুর, দেওভোগ, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, পাঁচঘড়িয়াকান্দি ও কাটাখালিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ এসেছে।

ক্ষোভে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও

টানা লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৩ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন শতাধিক গ্রাহক। প্রায় এক ঘণ্টা বিক্ষোভের পর পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিক্ষোভকারীরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত গরমের মধ্যে প্রতিদিন দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ৫০ মেগাওয়াট

মুন্সিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শেখ মানোয়ার মোরশেদ জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণেই গ্রাহক পর্যায়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১১৪ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানান তিনি।

এর আগে ২ আগস্টও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, জেলার চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ার কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

গরমে বাড়ছে ভোগান্তি

দিনের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ফ্যান ও পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকতেই পারে; কিন্তু দিনের পাশাপাশি মধ্যরাত ও ভোরেও যদি দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে?

তাঁদের দাবি, সরবরাহ সংকটের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি অন্তত লোডশেডিংয়ের একটি কার্যকর ও পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি জানানো হোক। একই সঙ্গে দ্রুত জাতীয় গ্রিড থেকে মুন্সিগঞ্জের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়ে জনভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ