মুন্সিগঞ্জের গর্ব উপমহাদেশের দ্বিতীয় আলেম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক
মুন্সিগঞ্জ, ১ জুলাই ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
বাংলাদেশের ধর্মীয়, শিক্ষাবিদ ও ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নাম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক রহ.। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ, সহীহ বুখারী শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদক, দীর্ঘ ৬৫ বছর দরসে বুখারী প্রদানের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী এবং অসংখ্য আলেম তৈরির কারিগর।
মুন্সিগঞ্জের এই কৃতী সন্তান ইলম, গবেষণা, লেখনী ও দ্বীনি খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক রহ. ১৯১৯ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার কনকসার ইউনিয়নের ভিরিচ খাঁ গ্রামের সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আলহাজ্ব এরশাদ আলী। জন্মের কয়েক বছর পরই মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এরপর নানাবাড়িতে নানী ও খালার স্নেহে তাঁর শৈশব কাটে।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে শিক্ষা অর্জনের প্রবল আগ্রহ ছিল। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর সাত বছর বয়সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর তত্ত্বাবধানে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন শেষে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি বহু খ্যাতিমান আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ., আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ., মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., হাফেজ্জী হুজুর রহ., মাওলানা রফিক আহমদ কাশ্মীরী রহ. এবং মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী রহ. প্রমুখ।
উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের গুজরাটের জামিয়া ইসলামিয়া ডাভেলে যান। সেখানে আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.-এর কাছে সহীহ বুখারী শরীফ অধ্যয়ন করেন। তাঁর দরসের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তিনি লিপিবদ্ধ করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী রহ.-এর কাছে তাফসির বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৪০-এর দশকে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে। সেখানে কয়েক বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৫২ সালে জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগে যোগ দেন। এখানেই তিনি সহীহ বুখারী শরীফের দরস প্রদানের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। দীর্ঘদিন বুখারী শরীফের পাঠদানের কারণে তাঁকে ‘শায়খুল হাদিস’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তিনি ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় সহীহ বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন। তাঁর কাছে শুধু সহীহ বুখারী পড়েছেন এমন ছাত্রের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি বলে জানা যায়। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান আলেম রয়েছেন।
১৯৮৬ সালে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে জামিয়া মুহাম্মদিয়া আরাবিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এটি জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই তিনি দীর্ঘদিন হাদিসের শিক্ষা ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যান।
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক রহ.-এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো ১০ খণ্ডে সহীহ বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। বাংলা ভাষায় হাদিসের এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি অনুবাদ করতে তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর কঠোর পরিশ্রম করেন। প্রথমে সাত খণ্ডে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তা দশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে আলেম সমাজ—সবার কাছে এই গ্রন্থ ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।
এছাড়া তিনি ‘ফজলুল বারী শরহে বুখারী’, ‘মুসলিম শরীফ ও অন্যান্য হাদিসের ছয় কিতাব’, ‘মসনবীয়ে রুমীর বঙ্গানুবাদ’, ‘পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম’, ‘কাদিয়ানি মতবাদের খণ্ডন’, ‘মুনাজাতে মাকবুল’ ও ‘সত্যের পথে সংগ্রাম’সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি ইসলামী আন্দোলন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে নেজামে ইসলাম পার্টির কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সিনিয়র নায়েবে আমীর ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮৯ সালে খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন এবং আমৃত্যু দলটির আমীর ছিলেন।
১৯৯২ সালে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে তিনি ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকা থেকে অযোধ্যা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চে নেতৃত্ব দেন। এই কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। এছাড়াও কওমি মাদরাসার সরকারি স্বীকৃতি, ফতোয়া বিরোধী রায়সহ বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন।
তিনি ১৯৭৮ সালে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে সহীহ বুখারী পড়ান।
ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ, মালিবাগ শাহী মসজিদ ও আজিমপুর স্টেট জামে মসজিদে দীর্ঘদিন খতিব ছিলেন। জাতীয় ঈদগাহেও কয়েক বছর ঈদের ইমামতি করেন। এছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি পাঁচ ছেলে ও আট মেয়ের জনক ছিলেন। তাঁর পরিবারে বহু হাফেজে কোরআন রয়েছেন।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি হাদিসের দরস, লেখালেখি ও দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০১২ সালের ৮ আগস্ট। ৯৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের এই কৃতী সন্তান আজও বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা, হাদিস গবেষণা ও ইসলামী চিন্তাধারার জগতে স্মরণীয় এক নাম। তাঁর জ্ঞান, ত্যাগ ও অবদান দেশের ধর্মীয় ইতিহাসে দীর্ঘদিন প্রেরণা হয়ে থাকবে।









