মুন্সিগঞ্জের এক অন্ধকার জনপদে দুইশো শিশুর বসবাস, পড়ালেখার জন্য নেই কোন স্কুল
মুন্সিগঞ্জ, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, শিহাব আহমেদ (আমার বিক্রমপুর)
নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি ভেঙে দেয় না, ভেঙে দেয় অনেক ঘরহীন মানুষের জীবনের স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। মুন্সিগঞ্জের পদ্মা নদীর বুকে গড়ে ওঠা নুর বয়াতির চর তারই নির্মম উদাহরণ। নদীর এ প্রান্তে যখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলছে-শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, আলো-বিদ্যুৎ, চিকিৎসা আর যোগাযোগব্যবস্থায় মানুষ অভ্যস্ত-ঠিক দুই কিলোমিটার দূরে, পদ্মার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই চর যেন এক ভিন্ন জগত। যেখানে প্রায় তিনশো পরিবারের প্রাথমিক বয়সী দুইশো শিশু থাকলেও নেই কোনো শিক্ষাব্যবস্থা। যেন জীবন আছে, কিন্তু নেই জীবনের ন্যূনতম অধিকার।
এ বিষয়ে বেসরকারি টেলিভিশন স্টার নিউজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন-
জলবায়ু পরিবর্তনের কষাঘাতে ঘরবাড়ি হারিয়ে দুই দশক আগে শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল ইউনিয়নের পদ্মার বুকে জেগে ওঠে ‘নুর বয়াতির চর’। শুরুতে পাশের শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙনের শিকার কয়েকটি পরিবার বসতি গড়ে তোলে এখানে। এরপর ধীরে ধীরে গত ২০ বছরে ঠাঁই নিয়েছে প্রায় ৩০০ পরিবার।
সরেজমিনে ভাগ্যকুল বাজার থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে নুর বয়াতির চরে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। চরের শিশুদের দৈনন্দিন জীবন অন্যরকম। সকালবেলা চরজুড়ে কোনো স্কুলঘণ্টা বাজে না। বই-খাতা হাতে শিশুরা সারিবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে পড়ে না। বরং ছোট ছোট হাতে জাল, লাঠি কিংবা দড়ি। কেউ নদীতে মাছ ধরে, কেউ গরু-ছাগল চরায়, কেউ আবার বাড়ির কাজে বাবা-মায়ের সঙ্গে দিন পার করে। আজিজুল জানে না স্কুল কখন শুরু হয়। নয়ন আর তানজিলার কাছে শ্রেণিকক্ষ মানে কেবল কল্পনার কোনো দূরের জায়গা। তিনশো পরিবারের এই চরে প্রাথমিক বয়সী প্রায় দুইশো শিশু থাকলেও তাদের জন্য নেই কোনো শিক্ষাব্যবস্থা।

যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গর্ভবতী নারী, অসুস্থ শিশু কিংবা বৃদ্ধদের জন্য এই চর যেন এক নির্জন দ্বীপ। স্থানীয় অভিভাবক ও বাসিন্দাদের বক্তব্যে উঠে আসে ক্ষোভ আর হতাশা-শুধু একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হলে অন্তত সন্তানদের ভবিষ্যৎটা কিছুটা বদলাতো।
চরের শিশু আজিজুল (১০) বলে, ‘আমাদের চরে কোনো স্কুল নাই। নদী পার হইয়া ওপারে গিয়া পড়ালেখা করা আমাদের জন্য খুব কষ্টের। তাই আমরা সারাদিন গরু চরাই আর নদীতে জাল ফেলি। ইন্টারনেটে দেহি শহরের পোলাপান নতুন নতুন জামা পইরা স্কুলে যায়-আমাগোও তো মন চায়।’
আরেক শিশু তানজিলা বলে, ‘বই পড়তে মন চায়, কিন্তু আমাগো এইখানে কোনো মাস্টার নাই। দূরে গিয়া যে ভর্তি হমু আমাগো কোন জন্মসনদ নাই। চাইলেও ভর্তি নিবো না।’
নুর বয়াতির চরে সন্তানদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারা অভিভাবকদের কাছে স্বাস্থ্য, সুরক্ষা কিংবা শিশুদের বিকাশের অধিকার যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। অসুস্থ হলে ভরসা কেবল একটি নৌকা। বর্ষাকালে নদীর স্রোত আর ঝড়ো বাতাসে সেই নৌকা চালানোও হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো চর ডুবে যায় অন্ধকারে। নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটে নারী ও শিশুদের।

স্থানীয় অভিভাবক শেফালি বেগম বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা কী করে বড় হবে? স্কুল না থাকলে তারা কী শিখবে? একটায় যদি অসুস্থ হয় সেইটারে হাসপাতালে নিতে হয় একদিন পর। নতুন যে শিশুরা এখানে জন্ম নিচ্ছে তাদের ভবিষৎ কি আমরা জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, ‘ঘরবাড়ি তো আগেই নদী কেড়ে নিছে, এখন মনে হয় পোলাপানের কপালটাও পুড়তাছে। একটা প্রাইমারি স্কুল হইলে অন্তত আমাগো ছাওয়াল-পাওয়ালরা মানুষ হইতে পারতো। দেশে কত উন্নয়ন হয়, কিন্তু আমাদের চরে একটা ল্যাম্পপোস্ট কিংবা একটা স্কুল দেওয়ার লোক কেউ নাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘নুর বয়াতির চরের শিশুদের জন্য কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, নেই স্বাস্থ্যকর খাবারের নিশ্চয়তাও। ভাত আর আলু ভর্তার বাইরে পুষ্টিকর খাবার ক-তা তারা প্রায় জানেই না।’
শ্রীনগরের সামাজিক সংগঠক সাইফুল মৃধা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই যে শিশুদের দুর্গতি এজন্য আমাদের উচিৎ বিশ্ব মোড়লদের কাছ থেকে এর ক্ষতিপূরণ আদায় করা।’

নুর বয়াতির চরের শিশুদের এই দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসার জাহেদা আখতার বলেন, ‘চরের শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং দ্রুত দাবি পূরণের চেষ্টা আমরা করছি।’
শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে কোন প্রকল্প আসলে অবশ্যই আমরা গুরুত্বসহকারে নুর বয়াতির চরকে অগ্রাধিকার দেব। এখানে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন সকল ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কেউ এগিয়ে আসলে সেখানে সরকারি বই সরবরাহ থেকে শুরু করে সকল সহযোগিতা করা হবে।’


