আজ বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস; মুন্সিগঞ্জে নদী-পুকুরে মৃত্যু প্রতিবছর বাড়ছেই
মুন্সিগঞ্জ, ২৫ জুলাই ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
আজ (২৫ জুলাই) বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—“Unite to Turn the Tide” (আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই)। জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০২১ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ দেশে প্রতিবছর হাজারো মানুষ, বিশেষ করে শিশু, পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।
নদী-খাল, বিল, পুকুরবেষ্টিত জেলা মুন্সিগঞ্জেও এই নীরব মৃত্যুর মিছিল থামছে না। বরং স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে (জুলাই ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬) জেলায় অন্তত ৭টি আলোচিত পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই শিশু, কিশোর ও তরুণ।
তবে স্থানীয়দের দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়া আরও বেশ কিছু ঘটনা রয়েছে। প্রকাশ্যে আসা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো হলো—
১৯ আগস্ট ২০২৫: সদর উপজেলার নয়াগাঁও এলাকায় ধলেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে ৮ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫: শ্রীনগর উপজেলার পশ্চিম সিংপাড়া গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে নেমে কলেজছাত্র ইনতেশার ইসলাম আজবীর মৃত্যু হয়। (স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত)।
৩১ জানুয়ারি ২০২৬: পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তসংলগ্ন পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমে মিরপুর মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী আবু নাঈম নিখোঁজ হন। দুই দিন পর ফায়ার সার্ভিস তার মরদেহ উদ্ধার করে।
ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় (মার্চ–এপ্রিল ২০২৬): সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে কিশোর রাকিব নিখোঁজ হয়। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর ডুবুরি দল তার মরদেহ উদ্ধার করে।
১ মে ২০২৫: গজারিয়া উপজেলার চর কিশোরগঞ্জ এলাকায় মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে কলেজছাত্র ইমাম হোসেন নয়ন স্রোতে তলিয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের যৌথ অভিযানে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২৩ মে ২০২৬: সদর উপজেলার দেওভোগ এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে নেমে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী—লাবিব ওয়াদী সোপান ও আজওয়াদ তাওসিফ—পানিতে ডুবে মারা যান। বন্ধুদের উদ্ধারচেষ্টা ব্যর্থ হলে স্থানীয়রা তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা কেবল প্রকাশ্যে আসা কয়েকটি উদাহরণ। মুন্সিগঞ্জের মতো নদীবেষ্টিত জেলায় বাড়ির পাশের পুকুর, খাল ও নদীতে গোসল, খেলাধুলা কিংবা অসতর্কভাবে পানির ধারে যাওয়ার কারণে প্রতি বছরই শিশু ও তরুণদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের মতে, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক দুর্ঘটনা থানায় মামলা বা জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।
বাংলাদেশে ভয়াবহ চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর বড় অংশই শিশু। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে যাওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
কেন বাড়ছে এই মৃত্যু?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুন্সিগঞ্জের মতো নদীবেষ্টিত জেলায় ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ—
বাড়ির পাশেই অসংখ্য পুকুর, খাল ও ডোবা।
বর্ষাকালে নতুন জলাবদ্ধতা ও অস্থায়ী জলাশয় সৃষ্টি হয়।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে, যখন অভিভাবকেরা গৃহস্থালি বা কর্মব্যস্ততায় থাকেন।
ছোট শিশুদের কয়েক মিনিটের জন্যও নজরদারির বাইরে রাখা প্রাণঘাতী হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পানিতে ডুবে যাওয়া সাধারণত নীরবে ঘটে। সিনেমার মতো চিৎকার বা হাত নেড়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকে না। ফলে আশপাশের মানুষ বুঝে ওঠার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
কী করলে কমবে মৃত্যু?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি সহজ পদক্ষেপই অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে পারে—
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের কখনোই পানির কাছে একা না রাখা।
বাড়ির পুকুর ও ডোবার চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া দেওয়া।
শিশুদের জন্য কমিউনিটি ডে-কেয়ার চালু করা।
বিদ্যালয়ে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।
স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধারকৌশল ও সিপিআর (CPR) প্রশিক্ষণ বাড়ানো।
বাংলাদেশে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB) পরিচালিত ‘আঁচল’ ও ‘SwimSafe’ কর্মসূচি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমাতে ইতোমধ্যে কার্যকর ফল দেখিয়েছে।
নীরব এই সংকট রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যু কেবল দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট। তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—এই চারটি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়।
বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবসে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জসহ সারা দেশে এই নীরব মৃত্যুর মিছিল থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য—সামান্য সচেতনতাই পারে একটি পরিবারকে আজীবনের শোক থেকে রক্ষা করতে।









