আজ ২৯ জুন: ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চ ডুবে প্রাণ যায় মুন্সিগঞ্জের ৩৬ জনের, ৬ বছরেও শেষ হয়নি বিচার
মুন্সিগঞ্জ, ২৯ জুন ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
ছয় বছর আগে বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কবে নাগাদ মামলার নিষ্পত্তি হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। স্বজন হারানো পরিবারগুলো বিচার পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে।
২০২০ সালের ২৯ জুন সকালে ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যায় মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’। বড় আকারের ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে নদীতে তলিয়ে যায় ছোট আকারের এই লঞ্চটি। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৪ জন যাত্রী।
ঘটনার দিন সকাল সোয়া ৯টার দিকে সদরঘাটের কাছে শ্যামবাজার এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিক থেকে আসা ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের ধাক্কায় ‘মর্নিং বার্ড’ ডুবে যায়। দুর্ঘটনার সেই মুহূর্তের দৃশ্য সদরঘাট এলাকার একটি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, আকারে বড় লঞ্চটির ধাক্কায় ছোট লঞ্চটি ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পানির নিচে চলে যায়।
এ ঘটনায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগে ঘটনার দিনই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন নৌ-পুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল।
মামলায় ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন সদরঘাট নৌ থানার এসআই শাহিদুল আলম।
মামলার আসামিরা হলেন—ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা, সহকারী মাস্টার জাকির হোসেন, চালক শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, সুকানি নাসির হোসেন মৃধা, গিজার হৃদয় হাওলাদার, সুপারভাইজার আব্দুস সালাম, সেলিম হোসেন হিরা, আবু সাঈদ ও দেলোয়ার হোসেন সরকার। বর্তমানে আসামিরা সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।
২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজওয়ানুজ্জামানের আদালতে বিচারাধীন।
মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং সাফাই সাক্ষ্যের ধাপ শেষ হয়েছে। এখন শুধু যুক্তিতর্ক উপস্থাপন বাকি। যুক্তিতর্ক শেষ হলেই মামলাটি রায়ের পর্যায়ে যাবে।
সবশেষ গত ১৫ মে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য ছিল। তবে ওইদিন তা হয়নি। আগামী ৬ জুলাই যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর খান মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, মামলাটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষ করে দ্রুত রায় দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, আসামিপক্ষ সময়ক্ষেপণ করায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যেন ন্যায়বিচার পায়, সেটিই রাষ্ট্রপক্ষের লক্ষ্য।
ওই দুর্ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের রিকাবীবাজার গ্রামের পাঁচজন নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন শিপলু। ছেলেকে হারিয়ে তার বাবা এখনো চান দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি।
তিনি বলেন, “ছেলেটা পড়াশোনা শেষ করে আমার সঙ্গে ঢাকায় ব্যবসা করতো। আমরা মামলা করিনি, পুলিশ মামলা করেছে। যাদের কারণে এত বড় দুর্ঘটনা হয়েছে, তাদের সাজা হওয়া উচিত।”
একই গ্রামের আওলাদ হোসেন হারিয়েছেন আপন দুই ভাই-বোনকে। তিনি জানান, তার ছোট ভাই দিদার হোসেন তার সঙ্গেই চাকরি করতেন। আর ছোট বোন হাফেজা খাতুন রুমা ঢাকায় যাওয়ার পথে ওই দুর্ঘটনার শিকার হন।
আওলাদ হোসেন বলেন, “দুইজনকেই হারিয়েছি ওই দুর্ঘটনায়। যারা অবহেলা করেছে, তাদের শাস্তি চাই।”
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
আইনজীবী শাহ জালাল বলেন, “এই মামলায় কোনো প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ সাক্ষী নেই। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা শুধু দুর্ঘটনা দেখেছেন, কিন্তু কোনো আসামির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালতে আসামিরা খালাস পাবেন।
ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকের আইনজীবী সুলতান নাসের বলেন, মূল সাক্ষীদের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। তাদের বক্তব্যে কোনো আসামির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “সাক্ষীরা শুধু লঞ্চ ডুবে যেতে দেখেছেন। কে কাকে ধাক্কা দিয়েছে, তা কেউ বলতে পারেননি। আশা করছি, আসামিরা মামলার দায় থেকে খালাস পাবেন।”
ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদারের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনার আট দিন আগে ২১ জুন ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। নৌ-অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনেও তার নাম ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
মর্নিং বার্ড ডুবে যাওয়ার ঘটনায় প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তৎকালীন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, “যেভাবে ঘটনা ঘটেছে, আমার মনে হয়েছে এটা পরিকল্পিত। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড।”
তবে সেই ঘটনার ছয় বছর পরও বিচার শেষ না হওয়ায় নিহতদের পরিবারগুলোর অপেক্ষার অবসান হয়নি। বুড়িগঙ্গার পানিতে হারিয়ে যাওয়া ৩৪ প্রাণের স্বজনরা এখনো তাকিয়ে আছেন আদালতের রায়ের দিকে।









