বিদেশে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছে দিঘিরপাড়ের পাটের হাট
1

মুন্সিগঞ্জ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মাথাভর্তি সোনালি আঁশ। নদীর বুকজুড়ে সারি সারি ট্রলার। প্রতিটি ট্রলারে স্তূপ করে রাখা পাট। ভোর থেকেই কৃষক, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পদ্মাপাড়ের দিঘিরপাড়। বর্ষা মৌসুমে মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড়ে বসা ঐতিহ্যবাহী পাটের হাট যেন কয়েক মাসের জন্য পরিণত হয় নদীকেন্দ্রিক এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রে।

প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই হাটের গোড়াপত্তন ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রতি বছর পাটের মৌসুমে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহে দুই দিন—সোমবার ও শুক্রবার—বসে এই হাট। শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জের চরাঞ্চলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ট্রলারভর্তি পাট নিয়ে আসেন এখানে।

দিঘিরপাড় বাজার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মণ পাট বিক্রি হয়। মান, আকার ও রংভেদে প্রতি মণ পাটের দাম সাম্প্রতিক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল। ফলে একটি হাটেই কোটি টাকার বেশি পাটের বেচাকেনা হয় বলে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য।

স্থানীয়দের কাছ থেকে কেনা এসব পাটের বড় একটি অংশ পরে চলে যায় দেশের বিভিন্ন পাটকলে। নদীপথে সহজে পাট আনা-নেওয়া এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনার সুযোগ থাকায় দিঘিরপাড়ের হাটটি দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে একদিকে কৃষক তাঁদের উৎপাদিত পাট বিক্রির বড় বাজার পাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও দ্রুত পাট সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতা ও পাটকলের কাছে সরবরাহ করতে পারছেন।

নদীপথই এই হাটের প্রাণ

দিঘিরপাড়ের পাটের হাটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাসমান চরিত্র। সড়কপথের পাশাপাশি নদীপথে পাট পরিবহনের সুযোগ থাকায় দূরদূরান্তের চরাঞ্চল থেকে তুলনামূলক সহজে এখানে পাট নিয়ে আসা যায়। পদ্মা ও আশপাশের নৌপথকে কাজে লাগিয়ে মৌসুমে শত শত ট্রলার এই অঞ্চলে জড়ো হয়।

পাট ব্যবসায়ীদের মতে, কৃষকের উৎপাদনস্থলের কাছাকাছি নৌপথে পরিবহন সুবিধা থাকায় মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন ব্যয় কিছুটা কমে। আবার বড় পরিমাণে পাট এক জায়গায় জড়ো হওয়ায় ক্রেতারাও এখান থেকে প্রয়োজনীয় পাট সংগ্রহ করতে পারেন।

দিঘিরপাড় থেকে পাটকল, পাটকল থেকে বিদেশ

দিঘিরপাড়ের হাটে বিক্রি হওয়া কাঁচা পাট সরাসরি বিদেশে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পাটকলে গিয়ে নানা ধরনের পাটপণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাট থেকে তৈরি হয় বস্তা, চট, দড়ি, কার্পেট, সুতা, ব্যাগসহ নানা ধরনের পণ্য। বর্তমানে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি পাট থেকে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত ও পরিবেশবান্ধব পণ্যও।

বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদক এবং পাটজাত পণ্যের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় পাটভিত্তিক পণ্যের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্যেও পাট ও পাটজাত পণ্যকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১০৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন টাকা, যা মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় ৮৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

জাতীয় সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আরও জানা যায়, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে মোট ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করেছে। এর মধ্যে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে এসেছে ১২ হাজার ৬১২ কোটি টাকার বেশি এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে ৭১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বেশি।

কাঁচা পাটের চেয়ে বাড়ছে মূল্য সংযোজিত পণ্যের গুরুত্ব

একসময় পাটের প্রধান ব্যবহার ছিল বস্তা, চট ও দড়ি তৈরিতে। সময়ের সঙ্গে পাটের ব্যবহার বহুমুখী হয়েছে। এখন পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে ফ্যাশনেবল ব্যাগ, কার্পেট, ঘর সাজানোর সামগ্রী, জিও-টেক্সটাইল, প্যাকেজিং সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এসব বহুমুখী পাটপণ্যের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

পাটের সেলুলোজ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে ‘সোনালি ব্যাগ’ নামে পরিচিত জুট-পলিমার। গবেষণায় এটিকে পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশে কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য সোনালি ব্যাগ ব্যবহারের উদ্যোগও নেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, জুট সেলুলোজভিত্তিক এই বায়োপলিমারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থাৎ দিঘিরপাড়ের মতো স্থানীয় হাটে উৎপাদিত কাঁচা পাট শুধু প্রচলিত চট বা বস্তার কাঁচামাল নয়; ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বাজার

দিঘিরপাড়ের হাট শুধু পাট ব্যবসার কেন্দ্র নয়, চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয়কেন্দ্র। জমিতে পাট ফলানোর পর দূরের বাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নদীপথে তুলনামূলক সহজে পাট এনে এখানে বিক্রি করতে পারেন তাঁরা।

পাটের মৌসুমে এই হাটকে ঘিরে নৌকার মাঝি, শ্রমিক, পাট বহনকারী, আড়তদার, পাইকার ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষেরও কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ফলে হাটটির অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু পাট বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি বিস্তৃত স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা।

সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও আছে

পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত হলেও বর্তমানে এ খাতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় প্রায় ১১৬ কোটি ডলারে উঠলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৮২ কোটি ডলারে নেমে আসে বলে সাম্প্রতিক সরকারি নীতিপরিকল্পনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় শুধু কাঁচা পাট বিক্রি নয়, পাট থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। সরকারের প্রস্তাবিত পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

ঐতিহ্য থেকে সম্ভাবনার পথে

প্রায় দুই শতাব্দী আগে ব্রিটিশ আমলে যে হাটের জন্ম, সেটিই এখনো পদ্মাপাড়ের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অন্যতম বড় পাট বেচাকেনার কেন্দ্র। জুন থেকে সেপ্টেম্বর—মাত্র কয়েক মাসের মৌসুমে দিঘিরপাড়ের নদীতে ভেসে ওঠে পাটের বিশাল বাজার।

এখানে কৃষকের হাতে উৎপাদিত পাট প্রথমে আসে স্থানীয় বাজারে, সেখান থেকে যায় দেশের পাটকলগুলোতে। এরপর বস্তা, চট, রশি, কার্পেট, ব্যাগ কিংবা আধুনিক পরিবেশবান্ধব পণ্য হয়ে সেই পাট পৌঁছে যায় দেশ-বিদেশের বাজারে।

তাই দিঘিরপাড়ের পাটের হাটকে শুধু একটি স্থানীয় হাট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পদ্মাপাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী বাজারটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি, নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং দেশের পাটভিত্তিক রপ্তানি অর্থনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে চলেছে। সোনালি আঁশের সেই সংযোগই কৃষকের উৎপাদন থেকে শুরু করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দীর্ঘ যাত্রায় ভূমিকা রাখছে।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ