বাঙালির গর্ব, বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান সাতারু ব্রজেন দাস; এক বীরের গল্প!
মুন্সিগঞ্জ, ১৫ জুন ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
আলসে বলে বেশ দুর্নাম আছে বাঙালী জাতির। আমরা পরিশ্রম করতে চাই না, স্বভাবে অতিরিক্ত আরামপ্রিয়, কিংবা অল্পতেই তুষ্ট হবার অভ্যাস আছে আমাদের। কিন্ত আমাদেরই কিছু পূর্বপুরুষ সামর্থ্যের সীমা ভেঙেছিলেন, দেখিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালীর রক্তে কত তেজ, সে তেজের বলে বলীয়ান হয়ে বাঙালী পাড়ি দিতে পারে সাগর-মহাসাগর, অবাধ্য জেদ চেপে বসলে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে বীর বাঙালী নতুন কীর্তিগাঁথা রচনা করে সারাবিশ্বে ফেলে দিতে পারে হইচই, জন্ম দিতে পারে নতুন ইতিহাসের! আজ তেমনই এক বীর বাঙালীর গল্প শোনাবো, নাম তার ব্রজেন দাস, আমাদের মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের কুচিয়ামোড়া গ্রামের মানুষ ব্রজেন দাস। জন্ম ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর।
১৯৯৮ সালের ১ জুন কলকাতায় মারা যান এই প্রখ্যাত সাঁতারু, পরের বছরই তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর সংখ্যা পাক্ষিক অনন্যা ম্যাগাজিনে ‘ব্রজেন দাসের কথা’ শিরোনামে নিজের জীবনের গল্প বলেছিলেন বাংলাদেশের এই কৃতী সন্তান।
তিনি লেখেন, ‘ছোটবেলায় আমি ছিলাম খুব মুডি, ধীর, স্থির ও জেদি। আমি ও মা দেশের বাড়িতে থাকি। বাড়িতে যে কাজের ছেলেটি থাকে, সে প্রতিদিনই কাজের ফাঁকে ছিপ ফেলত পুকুরঘাটে। একদিন ও খেতে গেলে আমিই চুপি চুপি ছিপ ফেললাম। কিছু সময় কাটল। হঠাৎ ছিপ হাত ছেড়ে চলে যেতে চায়, আমিও নাছোড়। কিন্তু বড় বেশি টান, জলে পড়লাম, তখনো হাতে ছিপ। ছাড়ব কেন? হয়তো চিৎকার করেছিলাম, মা ছুটে এসে আমার থেকেও বেশি হইচই বাঁধিয়ে জল থেকে আমাকে তুলে আনলেন। ছিপ তখনো আমার হাতে এবং ছিপের সুতার মাথায় গাঁথা ইয়া বড় এক শোল মাছ। জলে বিপদ সেই প্রথম টের পেলাম। বিপদের মোকাবিলায় সেই সাঁতার শুরু। বয়স তখন চার।
সাঁতার শেখার আধুনিক টেকনিক প্রথম শেখালেন প্রফুল্ল ঘোষ ও শ্যামাপদ গোস্বামী। তাঁরাই আমার শিক্ষাগুরু। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে যত সাঁতার প্রতিযোগিতা হয়, সব কটিতেই আমি প্রথম হই। এর মধ্যে ১৯৫৫ সালে এক মজার ঘটনা ঘটল। ঢাকায় তখন কোনো সুইমিংপুল ছিল না। চিফ সেক্রেটারি এম এম খান সত্যিকারের ক্রীড়ারসিক ও খেলাপাগল। তিনি একদিন ডেকে বললেন, দেখো, মাস তিনেক বাদে পাকিস্তান অলিম্পিকের আসর জমছে ঢাকায়। পূর্ববঙ্গের ছেলেরা কোন ইভেন্টে সবাইকে টেক্কা দিতে পারবে বলে তোমরা মনে কর? বললাম, সাঁতারে বাংলার ছেলেদের কেউ রুখতে পারবে না। আমাদের কথায় মাত্র আড়াই মাসে একটা আধুনিক সুইমিংপুল গড়ে তুললেন তিনি। সেবার আমি ১০০, ২০০ ও ৪০০ মিটার প্রতিযোগিতায় প্রথম হই।
১৯৫৬ সালে খবরের কাগজে প্রকাশিত এক সাঁতারুর অসাফল্যের সংবাদ আমাকে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমে উদ্বুদ্ধ করে। খবরটা পড়ার পর থেকে ভাবছি, যেভাবে হোক আমাকে ইংলিশ চ্যানেল পার হতেই হবে।
১৯৫৭ সালের জুলাইয়ে প্রথম ট্রায়াল। পুলে একনাগাড়ে ১২ ঘণ্টা সাঁতার কাটলাম। নদীতে পরের মাসে। ২৬ মাইল সাঁতার কাটলাম পুলে। ঠিক করলাম অবিরাম ৪৮ ঘণ্টা সাঁতার কাটব। ১৯৫৮ সালের ২৮ মার্চ রাত ২টা ২০। পদ্মার পাড়ে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সাঁতার কাটতে আরম্ভ করলাম। সকাল-দুপুর-বিকেল হলো, আমি সাঁতার কেটে চলেছি। হঠাৎ ঝড় উঠল। বছরের প্রথম কালবৈশাখী। সবাই বারবার আমাকে স্টিমারে উঠে আসতে বলছে, ইচ্ছা না থাকলেও শেষ পর্যন্ত উঠে আসতে বাধ্য হলাম। ১৩ ঘণ্টা সেদিন সাঁতার কেটেছিলাম। লক্ষ্য ছিল মাত্র আধমাইল দূরে।
বহু প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির পর ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে লন্ডনে পৌঁছালাম। বিমানবন্দরে পাকিস্তান হাইকমিশনের পক্ষে আমাকে রিসিভ করে। ডোভারে অপেক্ষা করছি। এমন সময় আমন্ত্রণ পেলাম ইতালি-মিসরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সাঁতার প্রতিযোগিতায়। জল উষ্ণ, দূরত্ব ৩৩ কিলোমিটার। চ্যানেল সাঁতরানোর তখনো এক মাস বাকি। আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম। সুন্দর দ্বীপ কাপ্রি থেকে সাঁতার শুরু হবে। নেপলসে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। আমি অ্যামেচার গ্রুপে সাঁতার কাটব। আমি একমাত্র এশিয়াবাসী।
একটি বোট দেওয়া হলো। ওই বোটেই আমার ম্যানেজার মহসীন ভাই। বোটটি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ওপরে (পার হয়ে) গেছে, লক্ষ্য (বাকি আর) মাত্র আধমাইল, কিন্তু তখনই স্টিমার থেকে আমাকে পথ বদলাতে বলা হলো। ম্যানেজার আপত্তি জানালেন। তারা তাদের যুক্তি দিল। কিন্তু কে বুঝবে তাদের ভাষা। আকারে ইঙ্গিতে চেষ্টা হলো, ফল হলো না। সোজা পথ ছেড়ে আমাকে একটু ঘোরা পথে যেতে হলো। ইজিপসিয়ান সাঁতারু কামরুদ্দীন সোজা পথে গিয়ে প্রথম হলো। ঘোরা পথে গিয়ে যখন লক্ষ্যে পৌঁছলাম, তার চার মিনিট আগেই কামরুদ্দীন পৌঁছে গেছে। আমি দ্বিতীয় হলাম।
চ্যানেল অতিক্রমের প্রস্তুতি চলতে লাগল।
১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট (চ্যানেলের ইংল্যান্ড অংশ) ডোভার থেকে বাস, তারপর প্লেনে করে চ্যানেল ক্রস করে ওপারে (ফরাসি অংশ কালে-তে) নিয়ে যাওয়া হলো। বিশ্রাম শেষে রাত ১২টার সময় আমাদের ডেকে তোলা হলো। বাইরে কাতারে কাতারে গাড়ি আর মানুষ। ছেলে-বুড়ো সব মিলে বেশ বড় একটা মেলা বসে গেছে। তার মধ্যে প্রতিযোগীদের কর্ডন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আমরা ড্রেস করছি, কেউবা (গা) গরম করে নিচ্ছে। ওরই ফাঁকে খবরের কাগজের লোক, রেডিওর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন দেশের সাঁতারুদের কাছে যায়, আমার দিকে আর কেউ আসে না। শেষ পর্যন্ত এক বৃদ্ধ সাংবাদিক আমার দিকে ধীরে সুস্থে এগিয়ে এল, ‘তুমি কিছু বলবে?’
রাগ চেপে বললাম, ‘না, আমার বলার কিছু নেই। আমি শুধু দেশবাসীর শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ চাই।’
ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে ফিরে গেল।
হুইসেল বাজাল। অস্বাভাবিক উত্তেজনা অনুভব করছি।
গর্জে উঠল পিস্তল। শুরু হলো সাঁতার। ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সাঁতার কাটার পর কে কোথায় গেল, বোঝার উপায় নেই। প্রতি সাঁতারুর সামনে লঞ্চে ওয়ারলেস অপারেটর আছে। কন্ট্রোল রুমে আছে একটা বিরাট বোর্ড। সেই বোর্ডে সাঁতারুদের নাম আছে। সঙ্গে নম্বর। আধঘণ্টা পরপর কত নম্বরের সাঁতারু কী অবস্থায় আছে, বোর্ডে দেখানো হচ্ছে। শুরুর আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত ১৯ নম্বর, অর্থাৎ আমি সবার চেয়ে এগিয়ে রইলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা আমাকে হারিয়ে ফেলল। আমি বোর্ডে ‘লস্ট’ হয়ে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর দেখি সব অন্ধকার। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার মাঝামাঝি সময়। রাতও বুঝি শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। থিকথিকে কুয়াশা। কোথায় লঞ্চ, কোথায় বোট। আবছা অন্ধকারে স্টিমারের আলো দেখে অনুসরণ করে চলেছি। স্টিমারের খুব কাছেও যাওয়া যায় না। চিৎকার করে ডাকলাম, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বুঝতে পারলাম অন্ধকার কুয়াশা ও প্রচণ্ড স্রোতে ছন্নছাড়া হয়ে গেছি। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা লঞ্চ যেন চোখে পড়ল। তখনো কুয়াশা, দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চলেছি। একসময় কুয়াশা কেটে গেল। চিৎকার করে উঠলাম। দেখতে পেলাম কূল।
প্রচণ্ড একটা ঢেউ আমাকে তীরে পৌঁছে দিল। মিসরের সাঁতারু আবদুর রহিমের ১৯৫০ সালের সবচেয়ে কম সময়ের রেকর্ড (১০ ঘণ্টা ৫০ মিনিট) ভেঙে গড়লাম নতুন রেকর্ড (১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট)।
১৯৬১ সালে রয়েল লাইফ সেভিং সোসাইটির সদস্য হলাম। অধিবেশনে যোগ দিতে লন্ডন গেছি। রানি এলিজাবেথ উদ্বোধন করবেন। ওখানে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন রানির সঙ্গে। এক ফাঁকে নিরিবিলি গিয়ে সোফায় বসলাম। দেখি পাশেই প্রিন্স ফিলিপস। পায়ে চোট, ব্যান্ডেজ বাঁধা। শুনেছিলাম ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে এই অবস্থা। ভদ্রলোক দু-চার কথা বললেন। এমন সময়ে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে হলরুমে ঢুকলেন। ফিলিপস হেসে বললেন, ‘যাও, রানি তোমায় ডাকছেন।’
রানি ডাকছেন? গুটি গুটি গিয়ে দাঁড়ালাম রানির সামনে, পাশেই মাউন্টব্যাটেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি চারবার চ্যানেল সাঁতরে পার হয়েছ?’
‘হ্যাঁ, চারবার। আবারও চেষ্টা করব।’
‘আবারও? কিন্তু কেন?’ রানি প্রশ্ন করেন।
সাঁতার কেটে চ্যানেল পার হওয়া, সে তো অনেকেই করেছে, আমি চাইছি রেকর্ড করতে, উত্তরটা দিয়ে নিজেই নিজের তারিফ করলাম। মনে মনে বললাম, হু হু এরই নাম বাঙাল।
তিনি নানা কথা জানতে চাইলেন ও আমার সাফল্য কামনা করলেন।
রেকর্ড করার পর টেলিগ্রামে আবার তাঁর অভিনন্দন পেলাম।’
যে কীর্তিগাঁথা তিনি রচনা করেছিলেন আজ থেকে ষাট বছর আগে, সেটা নিয়ে এখনও আলোচনা হয়, লোকে গর্ব করে বাঙালী ব্রজেন দাসের বীরত্বকে স্মরণ করে।
কি করেছিলেন ব্রজেন দাস? কেন তার এই কীর্তি নিয়ে ছয় দশক পরেও এত আলোচনা? ব্রজেন দাস সাঁতরেছেন, সাঁতার কেটে পার করেছেন ইংলিশ চ্যানেল, তাও এক দুইবার নয়, ছয়বার! উপমহাদেশের প্রথম সাঁতারু হিসেবে অনন্য এই কীর্তি গড়েছিলেন ব্রজেন। তবে পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল না তার জন্যে, পদে পদে হতে হয়েছে নানা বাধার সম্মুখীন। কিন্ত সেসব বাধাকে পায়ে দলে এগিয়ে গেছেন ব্রজেন দাস, রচনা করেছেন বিজয়গাঁথা।
ব্রজেন দাসের জন্ম মুন্সিগঞ্জে। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের মানুষজন সাঁতার ভালোবাসবে, এটাই স্বাভাবিক। ছোটবেলা থেকেই বুড়িগঙ্গার বুকে লাফ-ঝাঁপ দিয়েই শৈশব-কৈশরের সোনালী দিনগুলো কাটিয়েছেন ব্রজেন। ঢাকার কে এল জুবিলি হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে ব্রজেন দাস পড়তে গেলেন কলকাতা। তখনও ভারত ভাগ হয়নি। কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট আর বি.এ পাশ করেছিলেন ব্রজেন দাস, সাঁতারের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কটা তখন থেকেই জোরালো হয়। কৈশরের শখটাকে তিনি পরিণত করেছিলেন নেশায়।
ভারত ভাগ হলো, পূর্ব বাংলা তখন পাকিস্তানের একটা অংশ, শোষণ আর অত্যাচারের দিনগুলো শুরু হয়েছে, চলছে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে বঞ্চনা। খেলাধুলাও এর বাইরে পড়েনি। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সাঁতার ফেডারেশন গঠিত হয়েছিল, সেটার সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়েছিল লাহোরে। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে নদী কয়টা আছে সেটা হাতের আঙুল গুণেও বের করা যাবে। পূর্ববঙ্গে এত নদী, এত সাঁতারু, অথচ জাতীয় ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটিতে স্থান দেয়া হয়নি কোন বাঙালীকেই!
বঞ্চনার শেষ এখানেই নয়। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ন্যাশনাল অলিম্পিক, ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল সাঁতারে প্রথম হলেন ব্রজেন দাস। তিনি ততদিনে সাঁতারকে নেশা আর পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্ত তার এই বিজয় মানতে পারেনি পাকিস্তানী বিচারকেরা। মনগড়া কারণ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল ব্রজেন দাসকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঘা বাঘা অফিসারদের হারিয়ে সবার আগে সাঁতার শেষ করেছিলেন ব্রজেন। একজন ‘নীচুজাতের বাঙালে’র এমন সাফল্যে আঁতে ঘা লেগেছিল ওদের। সেকারণেই ব্রজেনকে ডিসকোয়ালিফাইড করেছিল বিচারকেরা। কিন্ত পরেরদিনের খবরের কাগজে এই অনিয়মের প্রতিবাদ করা হয় তীব্রভাবে। ফলশ্রুতিতে বিচারকেরা আবার ইভেন্টের আয়োজন করতে বাধ্য হলো, সেখানে আরও একবার বাকীদের পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হলেন ব্রজেন দাস।
পরের বছর পাকিস্তান অলিম্পিকেও ১০০ আর ৪০০ মিটারে চ্যাম্পিয়নের নাম ব্রজেন দাস। এই টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়নেরাই ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন, নিয়ম ছিল এটাই। কিন্ত ব্রজেন দাস বাঙালী হওয়ায় তার বেলায় পাল্টে গেল নিয়মটা! অস্ট্রেলিয়ায় পাকিস্তানের দলে পাঠানো হলো এমন প্রতিযোগীদের, যাদের পেছনে ফেলে জিতেছিলেন ব্রজেন দাস। পুরো পাকিস্তানে সাঁতার জগতে তিনি তখন অবিসংবাদিত সেরা, সেই সেরা খেলোয়াড়টিকে শুধুমাত্র জাতিগত বৈষম্যের কারণে বাদ পড়তে হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে।
খারাপ লেগেছে, কষ্ট পেয়েছেন, কিন্ত ভেঙে পড়েননি তিনি। দমে যায়নি তার আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাস। বৈষম্যের কারণে সুযোগ পাননি বিশ্বমঞ্চে নিজের সেরাটা দেখানোর, কিন্ত নিজেকে সেরাদের একজন হিসেবে প্রমাণ করার প্রতিজ্ঞাটা মনের ভেতরে পুষে রেখেছিলেন এই বাঙালী সাঁতারু। মনে তখন তার দারুণ জেদ, সাঁতারে দারুণ কিছু একটা করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের দেখিয়ে দিতে হবে, বুঝিয়ে দিতে হবে বাঙালীর রক্তের তেজ!
একদিন সকালে রোজকার মতো খবরের কাগজ পড়তে গিয়েই একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল তার। কয়েকবার পড়লেন তিনি খবরটা। কোন এক সাঁতারু পরপর চারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটার কথাই লেখা কলকাতার সেই পত্রিকায়। ইংলিশ চ্যানেল জিনিসটা কি সেটা তখনও জানেন না ব্রজেন দাস, কিন্ত মাথায় ভূত চাপলো, অন্যেরা যেটা পারছে না সেটাই করে দেখাবেন তিনি। নাস্তা করেননি তখনও, বাসী মুখে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, যেভাবেই হোক, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে হবেই তাকে!
খোঁজখবর শুরু করলেন তিনি, যে ভারতীয় সাঁতারু চারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, কলকাতায় গিয়ে পত্রিকা অফিস থেকে বের করলেন তার ঠিকানা। তার সঙ্গে দেখা করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিলেন। তারপর শরণাপন্ন হলেন ক্রীড়াঙ্গনে তার পরিচিত শুভাকাঙখীদের। তার মনোবাঞ্ছার কথা শুনেই আঁতকে উঠলেন সবাই। এই লোকে বলে কি! যেটা আজ পর্যন্ত ভূ-ভারতের কেউ করতে পারেনি, সেটা করার কথা ভাবছে সে! তাকে অনেক বোঝানো হলো, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার ভয়াবহ দিকগুলো সবাই যার যার ক্ষুদ্র জ্ঞানে তুলে ধরলেন তার সামনে। কিন্ত ব্রজেন দাস তো দমে যাওয়ার পাত্র নন মোটেও। তিনি তো মনে মনে শপথ নিয়ে ফেলেছেন, কিছু একটা করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের চমকে দিতে হবে। জবাব দিতে হবে বঞ্চনার, জানিয়ে দিতে হবে, শারিরীক সামর্থ্য কিংবা অন্য কোথাও বাঙালীরা পিছিয়ে নেই একটুও।
পরিচিতজনদের সাহায্যে ব্যবস্থা হয়ে গেল সবকিছুর। টাকা জোগাড় করাটা একটা বড় সমস্যা ছিল, সেটার সমাধান করা হলো চাঁদা তুলে। সরকারী সাহায্য মেলেনি এক কানাকড়িও। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের কাছে আবেদন করা হলো, তারা যেন ব্রজেনের ঢাকা-লণ্ডন-ঢাকা রুটের সৌজন্য টিকেট দেয়, কিন্ত তারা সাফ না করে দিলো। এরকম প্রত্যাখ্যান আরও নানা জায়গায় সইতে হয়েছে তাজে। শেষমেশ সবকিছু পায়ে মাড়িয়ে ব্রজেন দাস উড়াল দিলেন ফ্রান্সের লক্ষ্যে। শিল্পের নগরী প্যারিস, জাদুঘরের শহর প্যারিস। সেখানেই পা রাখলেন ব্রজেন দাস, যেটা তিনি করতে এসেছেন, সেটাকেও কি জাদুর চেয়ে কম কিছু বলা যায়?
১৯৫৮ সালের ৮ই আগস্ট। রাত পৌনে দুইটা। গভীর অন্ধকার চারদিকে, দুই হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না, এমন অবস্থা। কুয়াশার আবরণে ঢাকা চারদিক, হিমেল বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। পানি কণকণে ঠান্ডা, ঢেউয়ের তীব্রতাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকখানি বেশি। শনশন শীতল বাতাসে কেমন একটা অদ্ভুত রহস্যের গন্ধ। ব্রজেন দাস দাঁড়িয়ে আছেন তীরে, পাশে আরও জনা চল্লিশেক সাঁতারু; তেইশটি পৃথক দেশ থেকে ওরাও এসেছেন সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে। ঝুপ করে একটা শব্দ হলো, তারপর কয়েকটা, ব্রজেন সহ দলের সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পানিতে। সামনে গভীর অন্ধকারে ঢাকা সাগরপথ, পাড়ি দিতে হবে একুশ মাইল লম্বা দূরত্ব!
একশো আর চারশো মিটারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ব্রজেন দাস। তবে একটানা অনেক্ষণ সাঁতারের অভ্যাসও ছিল। ঢাকা-চাঁদপুর নদীপথে পাড়ি দিয়েছেন বেশ ক’বার। কিন্ত সেসবের সঙ্গে ইংলিশ চ্যানেলের তুলনা চলে না। কোন অভিজ্ঞতা নেই, লোকের মুখে শোনা কথাকে সম্বল করে ঝাঁপ দিয়েছেন তিনি অথৈ সাগরে। অবশ্য লণ্ডনে আসার পরে কয়েকদিন অনুশীলন করেছিলেন, কিন্ত সেটা নিতান্তই অপ্রতুল। তার ওপরে বিরুদ্ধ প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সামনে। পাশ দিয়েই চলছে চ্যানেল কমিটির পর্যবেক্ষক দলের বোট। হিমশীতল ঠাণ্ডায় শরীর জমে আসে ব্রজেন দাসের, হাত-পা নাড়াতে কষ্ট হয় প্রচণ্ড। তখন তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সেইসব অবহেলার স্মৃতিগুলো। পাকিস্তানের সেরা সাঁতারু হয়েও তিনি অংশ নিতে পারেননি অলিম্পিকে, শুধুমাত্র বাঙালী হবার ‘অপরাধে’! শরীরের রক্ত গরম হয়ে ওঠে তার। পানি কেটে এগিয়ে যেতে থাকেন ব্রজেন দাস, চোখেমুখে বিজয়ের স্বপ্ন, মনের ভেতরে পাকিস্তানী শোষকদের দেখিয়ে দেয়ার তাড়না।
দূরত্ব কমে আসতে থাকে ধীরে ধীরে, পনেরো-দশ-পাঁচ করে মাইলের সংখ্যা নেমে আসে তিন-দুই-একে। দলের অনেকেই ট্রলারে উঠে পড়েছে ইতিমধ্যে, হার মেনে নিয়েছে তার আগেই। ব্রজেন দাস হার মানেননি, বাঙালী কখনও হারার আগে হেরে যায় না। তেরো ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে পায়ের নীচে মাটির অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন ব্রজেন দাস। ততক্ষণে পূর্ব আকাশে সূর্য উঠে আবার মিলিয়েও গেছে, গোধুলীর আলোয় রাঙা সময়টায় লণ্ডনের মাটি সিক্ত হলো ব্রজেন দাসের পদস্পর্শে। এর আগে কোন এশিয়ান মানব এই কাজটা করে দেখাতে পারেননি, যেটা করেছেন ব্রজেন দাস!
পাকিস্তানের পতাকাটা বাতাসে পতপত করে উড়লো ব্রজেন দাসের সৌজন্যে। যে ব্রজেন দাসকে অবহেলার সঙ্গে ছুঁড়ে ফেলেছিল পাকিস্তানীরা, যে ব্রজেন দাসের প্রতিভাকে মূল্যায়ন করতে চায়নি তারা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বাঙালী হবার কারণে যাকে হতে হয়েছে বঞ্চনার শিকার, সেই ব্রজেন দাসের কৃতিত্বেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের নামটা একবার উচ্চারিত হলো শ্রদ্ধার সঙ্গে। ব্রজেন দাস নামের এক বীর বাঙালী আজ থেকে ষাট বছর আগে পাকিস্তানীদের সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন নিজের বীরত্বগাঁথা রচনা করে। যারা তাকে অবহেলা করেছিল। তাদেরকেই তিনি বাধ্য করেছেন তাকে নিয়ে গর্ব করতে, তাকে জাতীয় বীর হিসেবে মেনে নিতে। এমন বিজয় তো চাট্টেখানি কথা নয়!
এরপরেও ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন, একবার দুবার নয়, পাক্কা ছয়বার। সেই আমলে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশীবার ইংলিশ চ্যানেল পার করেছিলেন তিনিই। এরমধ্যে একবার পুরোটা পথ পেরিয়েছিলেন মাত্র দশ ঘন্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট সময়ে; সেই সময়ের রেকর্ড ছিল সেটা। অজস্র সম্মাননা আর পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল তাকে, বড় বড় দিগগজ সব লোকজন তার বন্দনায় মেতেছেন, তাকে প্রশংসার বৃষ্টিতে ভাসিয়েছেন। ব্রজেন দাস দেখিয়ে দিয়েছিলেন, বাঙালী চাইলে বিশ্বজয় করতে পারে, বাঙালী চাইলে রেকর্ডবুকে প্রলয়নাচন ধরিয়ে দিয়ে সবকিছু ওলট-পালট করে দিতে পারে!
হূমায়ুন আহমেদ ‘অনিল বাগচীর একদিন’ বইতে লিখেছিলেন- “পশ্চিমারা বাঙালীদের যতোটা তুচ্ছ করেছে, ততটা তুচ্ছ করার কিছু নেই। বরং জাতি হিসেবে এরা ভয়ঙ্কর। এরা মহাঅলস, একটু ভালোমন্দ খেতে পারলে মহাখুশী, গল্প করার সুযোগ পেলে খুশী। তবে এদের রক্তের মধ্যে কিছু একটা আছে, বড় কোন গণ্ডগোল আছে মাঝে মাঝে এরা ক্ষেপে যায়। কিছু বুঝতে চায় না, কিছু শুনতে চায় না। সাহস বলে যে বস্তু এদের চরিত্রে নেই, সেই জিনিস কোত্থেকে যেন চলে আসে!”
ব্রজেন দাস তো এমনই এক তারছেঁড়া বাঙালী ছিলেন, স্বদেশ আর স্বজাতীর অপমান যার বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল, বাঙালীর রক্তের তেজ দেখিয়ে দেয়ার তাড়নায় যিনি এক সকালের নেয়া সিদ্ধান্তে পাড়ি দিয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল। ব্রজেন দাস শুধু এক ইংলিশ চ্যানেলজয়ী সাঁতারু নন, ব্রজেন দাস বাঙালীর সাহসিকতার প্রতীক, এক বিজয়ী বীরপুরুষের নাম ব্রজেন দাস, যিনি জয় করেছেন মহাকাল!









