দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু
মুন্সিগঞ্জ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিল বিএনপি।আর তিন দশক পর নতুন একজন রাজনীতিবিদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেল বাংলাদেশ।
রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে এবারের শপথ অনুষ্ঠান হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় জাতীয় সংগীত এবং তারপর কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের এবং তারপর গোপনীয়তার শপথ নেন। সব শেষে তিনি শপথের নথিতে স্বাক্ষর করেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
এরপর নতুন মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সবশেষে প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে তাদেরকে শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে মঞ্চে ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
প্রতিমন্ত্রীদের শপথ এবং শপথে স্বাক্ষরের জন্য অনুষ্ঠান শেষ হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক রহমানের সঙ্গী হচ্ছেন ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারেক তার নতুন সরকার সাজিয়েছেন ৪০ জন নতুন মুখ নিয়ে। তাদের মধ্যে বিএনপির জোটের শরিক দুই নেতাও রয়েছেন।
অনেকেই প্রথমবার এমপি হয়েই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে গেছেন। তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তার মেয়ে দীনা আফরোজকে সঙ্গে নিয়ে। উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, চৌধুরী রফিকুল আববারকেও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা গেছে।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম বিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার বড় চমক খলিলুর রহমান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা দেওয়া এবং প্রস্তাবিত রোহিঙ্গা কোরিডোর নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বিএনপির অনেকে তার অপসারণও চেয়েছিলেন।
পররাষ্ট্র ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা খলিল এমপি না হলেও দায়িত্ব পালন করবেন টেকনোক্র্যাট হিসেবে। তিনি পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিনও।
১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের সদস্য ইয়াছিন এবার কুমিল্লা–৬ (সদর) আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে ওই আসনে দলের মনোনয়ন পান দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী।
ইয়াছিন তখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও গত ১৯ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক ফুটবলার মো. আমিনুল হকও টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সরকারে জায়গা পেয়েছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন আমিনুল। তবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুল বাতেনের কাছে হেরে যান। আমিনুলকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন মুখের ছড়াছড়ির মধ্যে বিএনপির অভিজ্ঞ ও পুরনো নেতাদের অনেকেরই সরকারে জায়গা হয়নি। তাদের মধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টামণ্ডলীর নেতারাও রয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাদপড়া ‘সিনিয়রদের’ মধ্যে কেউ-কেউ পরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান মন্ত্রিপরিষদের জায়গা পাননি। তাদের চারজনই বিএনপির প্রয়াত নেতা খালেদা জিয়ার কেবিনেটে ছিলেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান এবং বিএনপির এবারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানও সরকারে আসতে পারেননি।
বিএনপির সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মীর মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তাদের নাম নেই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আমান উল্লাহ আমানকেও তিনি নতুন সরকারে রাখেননি।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল টেকনোক্র্যাট হিসেবে মন্ত্রিসভায় আসতে পারেন বলে শোনা গিয়েছিল, তবে তা বাস্তবে ঘটেনি।
শরিক দলের নেতাদের মধ্যে নির্বাচনে জয়ী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দপ্তর বণ্টন অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন খলিলুর রহমান।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। ভূমি মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে মিজানুর রহমান মিনুকে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছেন নিতাই রায় চৌধুরী।
বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে। শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জহির উদ্দিন স্বপনকে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ আমিন উর রশীদকে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আফরোজা খান রিতাকে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আসাদুল হাবিব দুলু। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মো. আসাদুজ্জামানকে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পেয়েছেন জাকারিয়া তাহের। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছেন দীপেন দেওয়ান।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সরদার মো. শাহজাহান হোসেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ফকির মাহবুব আনামকে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ রবিউল আলম।


