উপমহাদেশের সুরের রানি শ্রেয়া ঘোষাল, যার শেকড় মুন্সিগঞ্জ- বিক্রমপুরে
মুন্সিগঞ্জ, ২৮ জুন ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
গানের মঞ্চে যার কণ্ঠে মুগ্ধ হয় কোটি শ্রোতা, যিনি বলিউড থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার সংগীতে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন—সেই শ্রেয়া ঘোষালের শেকড়ের গল্পটি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রাচীন পরগণা বিক্রমপুর অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে।
শ্রেয়া ঘোষাল—নামটি আজ শুধু একজন সংগীতশিল্পীর পরিচয় নয়, বরং সুরের এক অনন্য স্বাক্ষর। কিন্তু তার এই সুরেলা যাত্রার পেছনে রয়েছে এক পুরোনো গল্প, এক মাটির টান। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছেন, তার দাদুর বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। বহু বছর পর সেই শেকড়ের সন্ধানে ছুটে এসেছিলেন বিক্রমপুরের হাসাড়া গ্রামে। সেটা ২০১০ সালে
শ্রেয়া তখন বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, দাদুর বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু কোনো দিন দেখিনি। এবার বাংলাদেশে এসে সুযোগ পেলাম, তাই দাদার বাড়ি দেখতে চলে গেলাম।
বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষালকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার হাসাড়া গ্রামে। সেই গ্রামেই রয়েছে ঘোষাল পরিবারের পৈতৃক স্মৃতি। জানা যায়, তার দাদা সুধীরচন্দ্র ঘোষাল দেশ ভাগের আগেই কলকাতায় চলে যান। তবে বিক্রমপুরের সঙ্গে তাদের পারিবারিক সম্পর্কের স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে।
হাসাড়া গ্রামে গিয়ে শ্রেয়া দেখেছেন পূর্বপুরুষের ভিটে, কথা বলেছেন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা আর বিক্রমপুরের ঐতিহ্য তাকে ছুঁয়ে যায়। স্থানীয় দোকান থেকে খেয়েছেন বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, পান করেছেন ডাবের পানি।
তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘এখন সেখানে আমাদের খুব কাছের কেউ নেই, শুধু স্মৃতিটুকুই সম্বল। কিন্তু তারপরও মনে হচ্ছিল, এটাই আমার শেকড়। আমার জন্ম তো এখানেও হতে পারত।’
শ্রেয়া ঘোষালের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুন্সিগঞ্জের হাসাড়া স্কুলও। তার দাদা শিক্ষক ইন্দ্রমোহন ঘোষাল একসময় হাসাড়া স্কুলে শিক্ষকতা করতেন বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। ফলে শুধু একটি বাড়ি নয়, একটি গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার পূর্বপুরুষের জীবন ও স্মৃতি।
১৯৮৪ সালের ১২ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রেয়া ঘোষাল। ছোট বয়স থেকেই সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। মাত্র চার বছর বয়সে সংগীত শেখা শুরু করেন এবং পরে শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ নেন।
২০০০ সালে সংগীত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নজরে আসেন তিনি। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালির হাত ধরে বলিউডে অভিষেক ঘটে ‘দেবদাস’ সিনেমার মাধ্যমে। ওই সিনেমার গানগুলো তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। “জাদু হ্যায় নাশা হ্যায়”, “বরসো রে”, “তেরে মাস্ত মাস্ত দো নয়ন”, “দেওয়ানি মাস্তানি”সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান দিয়ে তিনি জায়গা করে নেন শ্রোতাদের হৃদয়ে। বাংলা, হিন্দি ছাড়াও তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়সহ বহু ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
তার ঝুলিতে রয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা। তিনি ভারতের অন্যতম সফল প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে পরিচিত।
শ্রেয়া ঘোষাল শুধু পেশাগত কারণে নয়, আবেগের জায়গা থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকায় তার কনসার্টে দর্শকদের ভালোবাসাও পেয়েছেন তিনি।
বিক্রমপুর সফরের পর তার কথায় ফুটে উঠেছিল সেই শেকড়ের অনুভূতি—‘শেকড়ের টান বড় অদ্ভুত। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে গান গাইতে খুব ভালো লাগে।’
আজ তিনি ভারতের সংগীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু সেই নক্ষত্রের আলোয় কোথাও মিশে আছে বিক্রমপুরের মাটির গন্ধ, হাসাড়া গ্রামের স্মৃতি আর পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া এক অদৃশ্য বন্ধন।







