মুন্সিগঞ্জের কৃতি সন্তান ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের ২২তম প্রয়াণ দিবস আজ
মুন্সিগঞ্জ, ১২ আগস্ট ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
ভাষাবিজ্ঞানী, প্রথাবিরোধী লেখক ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ২২তম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক এই লেখক। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সাহিত্য, ভাষাবিজ্ঞান ও প্রগতিশীল চিন্তায় তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করছেন পাঠক ও অনুরাগীরা।
১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন বিক্রমপুর অর্থাৎ বর্তমান মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়ীখাল ইউনিয়নের কামারগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন আজাদ। ছোটবেলা থেকেই মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেওয়া এই লেখক পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর গবেষণা যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনি কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক লেখার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।
মৌলবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর সরব অবস্থান তাঁকে নানা সময়ে বিতর্ক ও আক্রমণের মুখে ফেলে। বিশেষ করে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাস প্রকাশের পর একটি গোষ্ঠীর তীব্র আক্রোশের মুখে পড়েন তিনি।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী চাপাতি দিয়ে হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার পর ২২ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এবং পরবর্তী সময়ে ৪৮ দিন ব্যাংককে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
কয়েক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর গবেষণার কাজে ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট জার্মানিতে যান তিনি। এর পাঁচ দিন পর, ১২ আগস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মঞ্জুর কবির রমনা থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। তদন্তে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) সদস্যদের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আল-মামুন হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—জেএমবির শূরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শফিক, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগনে শহীদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ ও আনোয়ার কারাগারে রয়েছেন; সালাহউদ্দিন ও নূর মোহাম্মদ পলাতক।
পরবর্তী সময়ে মামলার আপিল শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হলেও এরপর মামলার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হুমায়ুন আজাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও মামলার বিচার ও রায় বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান হুমায়ুন আজাদ। ভাষাবিজ্ঞান ও সামগ্রিক সাহিত্যকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়।
মুন্সিগঞ্জের এই কৃতি সন্তান বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার জগতে আজও প্রভাবশালী এক নাম। তাঁর লেখা ও চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে যেমন আলোচিত, তেমনি তাঁর প্রথাবিরোধী অবস্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।









