মুন্সিগঞ্জের জীবন্ত কিংবদন্তি, আলেমদের শ্রদ্ধাভাজন আল্লামা আব্দুল হামীদ (পীর সাহেব মধুপুর)
মুন্সিগঞ্জ, ২৪ জুলাই ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
পদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী বিধৌত প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ মুন্সিগঞ্জ। বিক্রমপুরের এই উর্বর ভূমি যুগে যুগে বহু বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক সাধকের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান সময়ে এই জনপদের ধর্মপ্রাণ মানুষের সবচেয়ে বড় আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হলেন আল্লামা আব্দুল হামীদ, যিনি দেশ-বিদেশে ‘পীর সাহেব মধুপুর’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি কেবল একজন আধ্যাত্মিক পীর বা সাধকই নন; বরং একাধারে শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত, আপসহীন সমসাময়িক জননেতা এবং কোটি মুসলমানের ঈমানি আন্দোলনের এক অনন্য বাতিঘর।
আল্লামা আব্দুল হামীদ মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন এবং বেড়ে ওঠার পুরো অধ্যায় জুড়েই ছিল ইসলামের সুমহান আদর্শ। বর্তমানে তিনি প্রবীণ বয়সে পদার্পণ করেছেন এবং বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দ্বীনি খিদমতে পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর সুযোগ্য সন্তানেরাও তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে ইলমি ময়দানে এবং মধুপুর হাফেজিয়া আসলামিয়া মাদ্রাসার খিদমতে যুক্ত রয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গ্রাম আজ দেশজুড়ে চেনে এই মহান ব্যক্তির কারণে। এখানে অবস্থিত মধুপুরের পীর সাহেবের মাদরাসা ও খানকা শরিফ আজ লাখো তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আত্মশুদ্ধির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষ ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির উদ্দেশ্যে তাঁর সান্নিধ্যে ছুটে আসেন।
দুনিয়াবিমুখ এই সাধকের সরল জীবনযাপন, অমায়িক ব্যবহার এবং গভীর প্রজ্ঞা আধুনিক যুগের মানুষকে এক অলৌকিক প্রশান্তি দেয়।
খানকার চার দেয়ালে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস রক্ষায় তিনি সর্বদা রাজপথে গণমানুষের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শেষ নবী হওয়ার আকীদা (খতমে নবুওয়াত) সংরক্ষণে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে তিনি ‘সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদ বাংলাদেশ’-এর প্রধান আমিরের (আহ্বায়ক) দায়িত্ব অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পালন করছেন। তাঁরই নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়াত মহাসম্মেলন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশের ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক।
এছাড়াও তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক নায়েবে আমির হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসলামি আন্দোলনে তাঁর অবদান কেবল মৌখিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি সরাসরি ত্যাগের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ২০২১ সালের ২৮ মার্চ হেফাজতে ইসলামের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে তিনি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত ও গুলিবিদ্ধ হন। বয়োবৃদ্ধ শরীরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও দ্বীনের প্রতি তাঁর অবিচলতা দেশের আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সুস্থ হয়েই তিনি আবারও আল্লাহর দ্বীনের জন্য ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
সমাজ থেকে জাহেলিয়াত, কুসংস্কার ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে আল্লামা আব্দুল হামীদ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, হেফজখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বড় বড় ইসলামি মহাসম্মেলনগুলোতে তাঁর তেজস্বী কণ্ঠের বয়ান শোনার জন্য লক্ষাধিক মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
তাঁর প্রতিটি বক্তব্য সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, কুরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান এবং যুবসমাজকে সঠিক পথ দেখানোর দিকনির্দেশনায় সমৃদ্ধ থাকে।বার্ধক্যজনিত কারণে শরীর কিছুটা ক্লান্ত হলেও দ্বীনের অবমাননা কিংবা মুসলিম উম্মাহর সংকটে তাঁর কণ্ঠ এখনো সিংহশাবকের মতো গর্জে ওঠে।
মুন্সিগঞ্জের মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান মনীষী আজ সমগ্র বাংলাদেশের তৌহিদী জনতার এক অমূল্য সম্পদ এবং এক জীবন্ত কিংবদন্তি।









