৫ লাখ গাছ বিতরণ: বৃক্ষরোপণে দেশের দৃষ্টান্ত- বনসাই গবেষক মুন্সিগঞ্জের কে এম সবুজ
মুন্সিগঞ্জ, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার সন্তান খান মুহাম্মদ (কে এম) সবুজ। মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে চারটি তেঁতুলের চারা কিনে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তিন দশকের সেই সাধনা আজ তাকে নিয়ে গেছে বনসাই শিল্পের অনন্য উচ্চতায়। তার হাতে গড়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪৫০ প্রজাতির ২০ হাজারের বেশি বনসাই ও চারা গাছের বিশাল সংগ্রহ। তার সৃজনশীল বনসাই এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে ভারত ও মালয়েশিয়ায়।
এছাড়াও তিনি দেশব্যাপী এখন পর্যন্ত ৫ লাখ বৃক্ষ বিতরণ করেছেন। যা এক অনন্য রেকর্ড।
গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর আমবাগ এলাকায় প্রায় আড়াই বিঘা জমি এবং দুটি ভবনের ছাদজুড়ে গড়ে উঠেছে কে এম সবুজের বনসাই নার্সারি। সারি সারি সাজানো অসংখ্য বনসাইয়ের পাশাপাশি এখানে রয়েছে দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। কোনো কোনো বনসাইয়ের মূল্য কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত।
১৯৯৬ সালের গোড়ার দিকে সিলেটে বেড়াতে গিয়ে একটি নার্সারিতে বনসাই দেখে মুগ্ধ হন সবুজ। সেই মুগ্ধতা থেকেই বাসায় ফিরে ভাইয়ের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে চারটি তেঁতুলের চারা কিনে শুরু করেন বনসাই তৈরির সাধনা। তখন বনসাই নিয়ে কাজ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা বাজার—কোনোটিই ছিল না।
পড়াশোনার পাশাপাশি বাসার ছাদ, বারান্দা ও আঙিনা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে বনসাইয়ে। দীর্ঘ ১০-১২ বছরেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসায় পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। একপর্যায়ে বনসাইয়ের কারণে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। ঠিক সেই কঠিন সময়ে একটি বনসাই ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বদলে যায় তার ভাগ্যের চাকা। পরিবারও আবার তাকে উৎসাহ দিতে শুরু করে।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাণিজ্যিকভাবে বনসাই উৎপাদন শুরু করেন গাজীপুরে। বর্তমানে তার নার্সারিতে কাজ করছেন পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় ১২ জন শ্রমিক। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করে সেগুলোকে বছরের পর বছর পরিচর্যা ও নান্দনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বনসাইয়ে রূপ দেন তিনি।
কে এম সবুজের সংগ্রহে রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত বিরল উদ্ভিদ। তার নার্সারিতে ২৫০টির বেশি ফাইকাস প্রজাতির বট রয়েছে। রয়েছে নাগলিঙ্গম, হিজল, তমালসহ বিভিন্ন দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বনসাই। এসব গাছ সংরক্ষণের মাধ্যমে তার নার্সারিটি একসময় বনসাই জাদুঘরে পরিণত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বনসাই শিল্পকে শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি সবুজ। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তার তৈরি বনসাই ইতোমধ্যে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভারত ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার বনসাই এসব দেশে রপ্তানি করেন বলে জানান তিনি।
রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ক্রেতারা গাছগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যান। সেখানে জাহাজে পরিবহনের উপযোগী করে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে গাছের গোড়া মোড়ানো হয় এবং বিশেষভাবে টবে রাখা হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর গাছগুলো আবার টবে স্থাপন করে হরমোন প্রয়োগ করা হয়। এরপর নতুন পাতা গজাতে শুরু করে গাছগুলো।
বনসাই শিল্পের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন কে এম সবুজ। ব্যক্তিগত অর্থায়নে দেশজুড়ে পাঁচ লক্ষাধিক চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন তিনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভ্যান নিয়ে ঘুরে মানুষের মধ্যে চারা বিতরণ করেও পেয়েছেন তৃপ্তি। তার নিজস্ব গবেষণাগার ও ছাদবাগানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিরল ও ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে চলছে গবেষণা।
পরিবেশ ও বৃক্ষ সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার, জাতীয় যুব পদক এবং কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন এই পরিবেশকর্মী ও বৃক্ষগবেষক।
সবুজের মতে, বনসাই কেবল একটি গাছ নয়; এটি একটি শিল্পকর্ম। বছরের পর বছর একটি গাছকে ছোট পাত্রে বাঁচিয়ে রেখে নান্দনিক রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় একটি বনসাই। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিয়মিত পরিচর্যা এবং প্রশিক্ষণ।
দেশের তরুণদের এই শিল্পে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার নার্সারিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা এসে বনসাই সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ছাদ, বারান্দা কিংবা অল্প জায়গায় কয়েকটি বনসাই দিয়ে শুরু করে পরিবারের গৃহিণী, শিক্ষার্থী কিংবা বেকার তরুণরাও এ শিল্পের মাধ্যমে আয় করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
বনসাই নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও বড় পরিসরে যেতে চান কে এম সবুজ। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও বনসাই পাঠানো হয়েছে। শীতপ্রধান দেশগুলোর পরিবেশে এসব গাছ টিকে থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশের বনসাই রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা তার।









