নির্বাক সিনেমা থেকে ওটিটি: দেবদাস–ললিতারা বদলেছেন, শরৎচন্দ্র থেকে গেছেন
মানুষের প্রেম, বিরহ, সংসার, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—জটিল বিষয়গুলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন সহজ গল্পেকোলাজ
৩১

আজ কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। প্রায় এক শতাব্দী ধরে তাঁর গল্প ও চরিত্র ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমাকে প্রভাবিত করেছে। নির্বাক সিনেমা থেকে ওটিটি—মুখ ও মাধ্যম বদলেছে, শরৎচন্দ্র থেকে গেছেন। শরৎচন্দ্রর জন্ম ১৮৭৬ সালে, মৃত্যু ১৯৩৮ সালে। অথচ তাঁর চরিত্ররা এখনো পর্দার মানুষ। ১৯২৮ সালের নির্বাক ‘দেবদাস’ থেকে ২০২৩ সালের ‘দত্তা’—তাঁর পর্দাযাত্রাও প্রায় এক শতাব্দীর। এর মধ্যে বদলে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশ, বদলেছে সমাজ, বদলেছে সিনেমা।

সিনেমার প্রায় জন্মলগ্নেই শরৎচন্দ্রর পর্দাযাত্রা শুরু হয়েছিল সবাক সিনেমারও আগে। ১৯২৮ সালে নরেশ মিত্র ‘দেবদাস’কে নির্বাক চলচ্চিত্রে রূপ দেন। বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের গোড়ার যুগেই শরৎচন্দ্র হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের অন্যতম সাহিত্যিক আশ্রয়। ১৯৩১ সালে প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর পরিচালনায় তৈরি হয় ‘দেনা–পাওনা’। নিউ থিয়েটার্সের ছবিটিতে অভিনয় করেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, অমর মল্লিকসহ অনেকে। চিত্রগ্রহণে ছিলেন নীতিন বসু, সংগীতে রাইচাঁদ বড়াল। পরের বছর নিউ থিয়েটার্সের ব্যানারে শিশির ভাদুড়ীর পরিচালনায় আসে ‘পল্লীসমাজ’।

উপন্যাসে দেবদাসের মৃত্যু হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু সিনেমার পর্দায় চরিত্রটির যেন মৃত্যু নেই। এক প্রজন্মের দেবদাস বিদায় নিয়েছেন, আরেক প্রজন্মে অন্য কোনো জনপ্রিয় অভিনেতা এসে তাঁর জায়গা নিয়েছেন। ১৯৩৫ সালে নিউ থিয়েটার্সের ব্যানারে প্রমথেশ বড়ুয়া বাংলায় নির্মাণ করেন ‘দেবদাস’। নামভূমিকায় ছিলেন নিজেই, পার্বতী যমুনা বড়ুয়া, চন্দ্রমুখী চন্দ্রাবতী দেবী। একই বছর হিন্দি সংস্করণও নির্মিত হয় প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায়। সেখানে দেবদাস কুন্দনলাল সায়গল। এরপর বাংলা ও হিন্দির সীমানা পেরিয়ে তেলেগু, তামিল, মালয়ালমসহ বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছে যায় গল্পটি।

প্রশ্নটা তাই আসেই—শরৎচন্দ্রর গল্প কেন এতবার পর্দায় ফেরে? একটি কারণ তাঁর গল্পের দৃশ্যমানতা। কাহিনিতে ঘটনা আছে, নাটকীয়তা আছে, শক্তিশালী চরিত্র আছে, দ্বন্দ্ব আছে, আবেগ আছে। পাঠক অনেক সময় পড়তে পড়তেই যেন দৃশ্য দেখতে পান। আরও বড় কারণ তাঁর চরিত্র। শরৎচন্দ্র যে সমাজের কথা লিখেছিলেন, সেই সমাজ অনেকটাই বদলে গেছে। বদলেছে পরিবার ও সামাজিক কাঠামো। কিন্তু প্রেম, প্রত্যাখ্যান, শ্রেণি বিভাজন, নারীর সামাজিক অবস্থান, পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত কিংবা আত্মমর্যাদার প্রশ্ন কি শেষ হয়ে গেছে?

সময় বদলেছে, দেশ বদলেছে, বদলেছে পর্দায় গল্প বলার ভাষা। নির্বাক পর্দা কথা বলতে শিখেছে, সাদা–কালো সিনেমা রঙিন হয়েছে; সিনেমা হলের পাশে এসেছে টেলিভিশন, তারপর ওটিটি। বদলেছেন দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, ললিতা, রাজলক্ষ্মীরা। শুধু ফুরোয়নি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প। মানুষের প্রেম, বিরহ, সংসার, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অবস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—জটিল বিষয়গুলো তিনি বলেছেন সহজ গল্পে। আর সেই গল্পে আছে দৃশ্য, নাটকীয়তা, আবেগ ও মনে রাখার মতো চরিত্র। সম্ভবত সে কারণেই চলচ্চিত্রের গোড়ার যুগ থেকে নির্মাতারা বারবার তাঁর কাছে ফিরেছেন।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ