৬৫ রুপি বেতনের শিক্ষক থেকে প্যারিসের সুপারমডেল অঞ্জলি মেন্ডিসের রূপকথার যাত্রা
ভারতে প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণায় তাকে বলা হয়েছিল অনুপযুক্ত। কারণ, তার গায়ের রং ছিল কালো, উচ্চতা অনেক বেশি এবং শরীর ছিল রোগা। তবে যে বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য নিজ দেশে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন, হাজার মাইল দূরের প্যারিসে গিয়ে সেগুলোই তাকে অনন্য করে তোলে। কিংবদন্তি ফরাসি ডিজাইনার পিয়ের কারদাঁর দৃষ্টিতে পড়ার পরিনতিতে ৬৫ রুপি বেতনের কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ।
১৯৪৬ সালের ২৯ জানুয়ারি গোয়ান ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেওয়া ফিলিস মেন্ডিসের শৈশব ছিল বেশ দুরন্ত। সাত ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ এই তরুণী পড়াশোনায় খুব একটা ভালো না হলেও বই পড়তে ভালোবাসতেন। পরিবারের আর্থিক সংকট বাড়তে থাকায় তিনি মাসে মাত্র ৬৫ রুপি বেতনের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি নেন। তখন তার চোখে ছিল মোটা চশমা এবং পরনে সাধারণ পোশাক, যা প্রচলিত মডেলদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
বাসে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে কৌতূহলবশত তিনি ফ্যাশন শো সমন্বয়কারী জিনি নওরোজির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের পর তিনি প্রথম র্যাম্পে হাঁটেন। গায়ের রং নিয়ে নানা সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি নিজের দীর্ঘ পা, শরীর ও গাঢ় ত্বককে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। একটি ফটোশুট থেকে পাঁচ হাজার রুপি আয় করার পর তার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায় এবং প্যারিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
১৯৭১ সালে হাতে মাত্র ১৫০ ফ্রাঁ ও রিটার্ন টিকিট নিয়ে প্যারিসে পৌঁছান অঞ্জলি। ভারতীয় শাড়ি, খোঁপা ও কপালে টিপ পরে তিনি পিয়ের কারদাঁর বুটিকে হাজির হন। ভাষা না জানায় ইংরেজি ও এক কর্মীর সহায়তার মাধ্যমে তিনি কারদাঁর সাক্ষাৎ পান। শাড়ি পরে হাঁটার পর কারদাঁ তার পা ও দীর্ঘ শরীরের গড়ন দেখে ‘ফান্তাস্তিক’ বলে মন্তব্য করেন এবং পরদিন থেকেই তাকে হাউস মডেল হিসেবে কাজের প্রস্তাব দেন।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতে সহজে উচ্চারণের জন্য তার নাম রাখা হয় ‘অঞ্জলি’। পিয়ের কারদাঁ ছাড়াও তিনি গিভঁশি, উঙ্গারো ও শাপারেলির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন। এক দশমের বেশি সময় ধরে কারদাঁর মিউজ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারমডেলদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পেশাগত জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভালোবাসার মানুষ ও পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে গভীর শোকে পড়েন।
মডেলিংয়ের শীর্ষে থাকা অবস্থায় তিনি স্বেচ্ছায় র্যাম্প ছেড়ে দেন। পিয়ের কারদাঁ তাকে ভারতে নিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেখাশোনার দায়িত্ব দেন এবং প্রায় ১৮ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে রান্নার প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি বইও প্রকাশ করেন। ২০১০ সালের ১৭ জুন ফ্রান্সের প্রোভঁসে ৬৪ বছর বয়সে এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল মারা যান।









