‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’- ভয়ের পরিবেশে প্রতিবাদের ভাষা দেন আব্দুল হাই
মুন্সিগঞ্জ, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’—একটি বাক্য। অথচ এর মধ্যেই যেন আটকে ছিল বাংলাদেশের একটি সময়ের ভয়, শঙ্কা আর বাক্স্বাধীনতার সংকটের চিত্র।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী উপজেলা নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন মুন্সিগঞ্জের এক সমাবেশে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে কথাটি বলেছিলেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা আব্দুল হাই। এরপর বাক্যটি ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক স্যাটায়ার, মিম ও প্রতিবাদের ভাষায়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নানা অন্যায়-অনিয়মের সমালোচনায় নাম উল্লেখ না করেও নিজের বক্তব্য প্রকাশের প্রতীক হয়ে ওঠে এটি।
‘আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম’—আব্দুল হাইয়ের আরেকটি বহুল আলোচিত বাক্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে বলা এই কথাটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে দুটি বাক্যই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্যাটায়ারের পরিচিত উপাদান। অনেকের কাছে এগুলো ছিল কেবল হাস্যরসের বিষয় নয়; বরং ভয়ের পরিবেশে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নেওয়ার এক কৌশল।
সেই বাক্য দুটির স্রষ্টা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল হাই আর নেই। ৭৭ বছর বয়সে বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুতে মুন্সিগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
যেভাবে জনপ্রিয় হয় ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে পরিচিত। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ভোট বর্জন করে। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটের দিন সহিংসতা, ভোটকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সেই নির্বাচন বর্জন করেছিলেন বিএনপি নেতা আব্দুল হাইও। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও বিভিন্ন স্থানে কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেটে জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন তিনি।
সেই সমাবেশে নির্বাচনে কারচুপির প্রসঙ্গ তুলে আব্দুল হাই বলেছিলেন, পুলিশ সদস্যরা তাঁকে জানিয়েছেন কীভাবে ভোট চুরি হয়েছে। কিন্তু তাঁদের নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি। কারণ, নাম প্রকাশ করলে তাঁদের চাকরি থাকবে না।
তাঁর সেই বক্তব্যের ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ অংশটুকু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম কিংবা ভয়ের পরিবেশ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে এই বাক্য ব্যবহার করা হতে থাকে।
একসময় বাক্যটি আর শুধু আব্দুল হাইয়ের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্যাটায়ারের এক পরিচিত অনুষঙ্গ। যাঁরা সরাসরি কারও নাম নিয়ে সমালোচনা করতে চাইতেন না, তাঁরাও এই বাক্য ব্যবহার করে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করতেন। নাম না বলেও কাকে বোঝানো হচ্ছে, তা বুঝতে অসুবিধা হতো না অনেকের।
একটি বাক্য, একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গ্রেপ্তার, গুম ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে নানা সময়ে বিতর্ক হয়েছে। সরকারবিরোধী বক্তব্যের কারণে হয়রানির আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা। এসব প্রেক্ষাপটে ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ বাক্যটি আরও বিস্তৃত অর্থ পায়।
শেখ হাসিনার নাম সরাসরি উল্লেখ না করেও তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে অনেকে বাক্যটি ব্যবহার করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম, ব্যঙ্গচিত্র ও রাজনৈতিক আলোচনায় এটি হয়ে ওঠে পরোক্ষ প্রতিবাদের ভাষা।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দীর্ঘ সময়জুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্যাটায়ারে বাক্যটির ব্যবহার দেখা গেছে। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার ক্ষেত্রে এটি এমন এক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল, যার অর্থ বুঝতে আলাদা করে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।
‘আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম’
আব্দুল হাইয়ের আরেকটি বক্তব্য—‘আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম’—একইভাবে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ও ন্যায়বিচারের আকুতি ঘিরে তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে বাক্যটি মিম ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাক্যটির মধ্যে ছিল অভিযোগ, হতাশা ও বিচার না পাওয়ার বেদনা। রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও এটি সাধারণ মানুষের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে নির্বাচন কিংবা রাজনীতির প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া প্রকাশেও কথাটি ব্যবহৃত হতে থাকে।
একজন প্রবীণ রাজনীতিকের মুখ থেকে উচ্চারিত দুটি বাক্য কীভাবে সময়ের রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে উঠতে পারে, আব্দুল হাইয়ের এই বক্তব্যগুলো তার উদাহরণ। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের সঙ্গে একমত কিংবা দ্বিমত—দুই পক্ষের মানুষের কাছেই বাক্যগুলো পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
মুন্সিগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হাই। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
১৯৭৯ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন। ঢাকা-৮ ও মুন্সিগঞ্জ-৪ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আব্দুল হাই।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অষ্টম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন প্যানেল স্পিকার। রাজনৈতিক জীবনে অটল নীতি, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সাদামাটা চলাফেরা ও সহজ বাচনভঙ্গির কারণে মুন্সিগঞ্জের মানুষের কাছে তাঁর স্বতন্ত্র পরিচিতি ছিল।
বুধবার দিবাগত রাতে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা। তবে তাঁর বলা দুটি বাক্য রয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতি ও স্যাটায়ারের জগতে।
যে সময়ের মানুষ ভয়ের কারণে অনেক কথা সরাসরি বলতে পারতেন না, সেই সময়ে আব্দুল হাইয়ের বক্তব্যের দুটি লাইন অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। তাঁর রাজনৈতিক জীবন মূল্যায়নের নানা দিক থাকতে পারে, কিন্তু জনপরিসরে এই বাক্য দুটির প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রিয় আব্দুল হাই, আপনাকে মনে রাখবে মুন্সিগঞ্জ। মনে রাখবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্যাটায়ারের সেই সময়ও, যখন একটি বাক্যই হয়ে উঠেছিল অনেক না-বলা কথার ভাষা।









