গবেষণা: ২০ বছরে মুন্সিগঞ্জে জলাশয় কমেছে ২৭ শতাংশ, ঘন সবুজ আচ্ছাদন ৮২ শতাংশ
১১

মুন্সিগঞ্জ, ৫ নভেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

গত ২০ বছরে মুন্সিগঞ্জ জেলায় জলাশয়ের আয়তন কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি।

একই সময়ে জেলার ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমেছে প্রায় ৮২ শতাংশ। অন্যদিকে বসতি এলাকা বেড়েছে তিন গুণের বেশি। অনাবাদি ও উন্মুক্ত জমির আয়তনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার ভূমি ব্যবহার ও ভূ-আচ্ছাদনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ চিত্র পেয়েছেন।

গবেষণায় পদ্মা সেতু নির্মাণ ও এর ফলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণাটি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

গবেষণাটি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ফাহিম মুনতাসির, মাশুরা শাম্মী ও শফি মোহাম্মদ তারেক; ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএসের এ বি এম সিদ্দিকুল আবেদিন এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ফরহাদুর রেজা।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে মুন্সিগঞ্জে জলাশয়ের আয়তন ছিল ১৪৫ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার।

২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০৫ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ ২০ বছরে প্রায় ৩৯ দশমিক ৪৯ বর্গকিলোমিটার জলাশয় কমেছে।

গবেষণায় হ্রাসের হার উল্লেখ করা হয়েছে ২৭ দশমিক ২১ শতাংশ।

তবে এই সময়ে জলাশয়ের আয়তন একটানা কমেনি।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ সালে জেলার জলাশয়ের আয়তন ছিল ৮১ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫ সালে তা আরও কমে হয় ৭৬ দশমিক ২৩ বর্গকিলোমিটার।

২০২০ সালে জলাশয়ের আয়তন দাঁড়ায় ৭৫ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটারে। এরপর ২০২৫ সালে তা কিছুটা বেড়ে ১০৫ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার হয়েছে।

অর্থাৎ সাম্প্রতিক পাঁচ বছরে জলাশয়ের আয়তন কিছুটা বাড়লেও ২০০৫ সালের তুলনায় তা এখনো অনেক কম।

জলাশয়ের পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জে ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদন ব্যাপকভাবে কমেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ সালে জেলায় ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদিত এলাকার আয়তন ছিল ৪৪৪ দশমিক ৫১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০ দশমিক ৫১ বর্গকিলোমিটারে। এই শ্রেণির ভূ-আচ্ছাদন কমেছে ৮১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

তবে অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বের উদ্ভিদ আচ্ছাদিত এলাকার আয়তন একই সময়ে বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

২০০৫ সালে এ ধরনের এলাকার আয়তন ছিল ১৯৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৮৬ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের পর থেকে এই শ্রেণির উদ্ভিদ আচ্ছাদনও কমতে শুরু করেছে।

গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বসতি এলাকার বিস্তার।

২০০৫ সালে মুন্সিগঞ্জে বসতি এলাকার আয়তন ছিল ৬০ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৮৭ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার। এ হিসাবে বসতি এলাকা বেড়েছে ২১১ দশমিক ২৭ শতাংশ।

একই সময়ে জেলার অনাবাদি ও উন্মুক্ত জমির আয়তন ৮৩ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ২৭২ দশমিক ৮৬ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে। বৃদ্ধির হার ২২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

গবেষকদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পকারখানা ও বসতি সম্প্রসারণ এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদন হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। এসব পরিবর্তন জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।

শরীয়তপুর ও মাদারীপুরেও কমেছে জলাশয়

গবেষণায় মুন্সিগঞ্জের পাশাপাশি শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার পরিবেশগত পরিবর্তনের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

তিন জেলার মধ্যে জলাশয়ের আয়তন সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে শরীয়তপুরে। ২০০৫ সালে জেলাটিতে জলাশয়ের আয়তন ছিল ৩২৬ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১৬৭ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ জলাশয়ের আয়তন কমেছে ৪৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

মাদারীপুরেও একই সময়ে জলাশয়ের আয়তন ১৫৭ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ৯১ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। কমেছে ৪১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

তবে ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদনের ক্ষেত্রে তিন জেলার চিত্র এক নয়। মুন্সিগঞ্জে এই শ্রেণির ভূ-আচ্ছাদন প্রায় ৮২ শতাংশ কমলেও শরীয়তপুরে বেড়েছে ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যদিকে মাদারীপুরে কমেছে ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, তিন জেলাতেই নগরায়ণ ও জলাশয় হ্রাসের প্রবণতা রয়েছে। তবে পরিবর্তনের মাত্রা এবং পরিবেশগত প্রভাব একেক জেলায় একেক রকম।

স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে গবেষণা

গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০৫, ২০১০, ২০১৫, ২০২০ ও ২০২৫ সালের ছবি বিশ্লেষণ করে তিন জেলার ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন নিরূপণ করেন গবেষকেরা।

এ জন্য ভূমিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—জলাশয়, বসতি, অনাবাদি ও উন্মুক্ত জমি, অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্বের উদ্ভিদ আচ্ছাদন এবং ঘন উদ্ভিদ আচ্ছাদন। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য ও গুগল আর্থের উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি ব্যবহার করে ফলাফল যাচাই করা হয়। বিভিন্ন বছরের ভূমি শ্রেণিবিন্যাসের নির্ভুলতার হার ছিল ৮০ থেকে ৮৬ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, জলাশয় ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে যাওয়ার ফলে প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হওয়া, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি উন্মুক্ত ও অনাবাদি জমির বিস্তার ভূমিক্ষয় এবং নদীতে পলি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গবেষকেরা পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে সংশ্লিষ্ট এলাকার নগরায়ণ ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে শুধু সেতু নির্মাণের কারণে কতটুকু পরিবর্তন ঘটেছে, তা গবেষণায় আলাদাভাবে পরিমাপ করা হয়নি।

গবেষণার সীমাবদ্ধতায় বলা হয়েছে, ব্যবহৃত ল্যান্ডস্যাট ছবির স্থানিক রেজল্যুশন ৩০ মিটার হওয়ায় ছোট পরিসরের কিছু পরিবর্তন শনাক্ত না-ও হতে পারে। এ ছাড়া ২০০৫ সালের আগের তথ্য গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ এবং জলাভূমি সংরক্ষণের সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।

তাঁদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ