এক্সপ্লেইনার: রক্তঝরা সংগ্রামের দিন পহেলা মে: যেভাবে শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস
মুন্সিগঞ্জ, ১ মে ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে পহেলা মে এক অনন্য দিন। প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। এটি শুধুমাত্র একটি দিবস নয়, বরং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং মানবিক মর্যাদার দাবিতে রক্তঝরা সংগ্রামের স্মারক।
শ্রমিকদের অমানবিক কর্মপরিবেশ
উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকদের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা এমনকি কখনও তারও বেশি সময় কাজ করানো হতো। অথচ মজুরি ছিল খুবই সামান্য। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বিশ্রাম কিংবা মানবিক অধিকার নিয়ে তখন মালিকপক্ষের তেমন কোনো ভাবনা ছিল না।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের দাবিতে ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিক সংগঠনগুলো “৮ ঘণ্টা কর্মদিবস” বাস্তবায়নের আন্দোলন শুরু করে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে এই দাবি কার্যকর করতে হবে।
শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তাক্ত ঘটনা
১৮৮৬ সালের ১ মে হাজার হাজার শ্রমিক শিকাগো শহরের রাস্তায় নেমে আসে। তারা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন ও ধর্মঘট পালন করে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে শ্রমিকদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তৃতা চলাকালে হঠাৎ এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পুলিশের দিকে বোমা নিক্ষেপ করে। এতে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এরপর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঘটনাস্থলে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন।
পরবর্তীতে শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পীজসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড এবং একজনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন—
“আজ আমাদের নীরবতা তোমাদের কণ্ঠের চেয়েও শক্তিশালী হবে।”
এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
কবে থেকে মে দিবস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়
শিকাগোর শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে ১ মে শ্রমিক দিবস পালনের প্রস্তাব ওঠে। পরে ১৮৯১ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ মে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০টির বেশি দেশে এদিন সরকারি ছুটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশে মে দিবস
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে সরকারিভাবে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী প্রদান, শ্রমিক সংগঠনের র্যালি, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
প্রতি বছর মে দিবস উপলক্ষে একটি প্রতিপাদ্যও নির্ধারণ করা হয়। শ্রমিক-মালিক ঐক্য ও শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার বার্তাই সাধারণত এসব প্রতিপাদ্যে উঠে আসে।
আমেরিকায় কেন ১ মে ছুটি নয়?
মজার বিষয় হলো, যে যুক্তরাষ্ট্রে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেখানে ১ মে সরকারি শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয় না। হে মার্কেটের ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মে মাসে শ্রমিক দিবস পালনে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা করেছিলেন। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সেপ্টেম্বর মাসে “লেবার ডে” পালন করা হয়।
শ্রমিক দিবসের তাৎপর্য
মে দিবস মূলত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায্যতার প্রতীক। শ্রমিকদের ঘাম ও পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, অর্থনীতি ও সভ্যতা। তাই এই দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের সম্মান জানানোর দিন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
কবি কাজী ইয়াকুবের ভাষায়—
“শ্রমিকের ঘাম, রক্তকণা তোমার গ্লাসের জুস,
সেই মজুরকে লাথি মারো, আসবে কবে হুঁশ।
তোমার বিদ্যার পুস্তকাদি শ্রমিকের হাতে বোনা,
শ্রমিক গড়ে দেশটা তোমার, মাটি হচ্ছে সোনা!”





