ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার স্কুল: মাধ্যমিক পর্যায়ে মুন্সিগঞ্জে আরেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ
মুন্সিগঞ্জ, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রমজান মাহমুদ (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জ মহকুমা সৃষ্টি হয় ১৮৪৫ সালে। তখন এ মহকুমায় থানা ছিল দুটি মুন্সিগঞ্জ ও শ্রীনগর। মুন্সিগঞ্জ পাকিস্তান সময়কাল হতেই আলবার্ট ভিক্টোরিয়া যতীন্দ্র মোহন সরকারি বালিকা বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৮৯২) ও কাজী কমর উদ্দিন সরকারি ইনস্টিটিউশন (স্থাপিত ১৯৪২) নামে একটি বালিকা ও একটি বালক সরকারি বিদ্যালয় ছিল। এ দুটি বিদ্যালয় ছিল জেলার সর্বপ্রাচীন সরকারি বিদ্যালয়।
এরপর হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়কালে শ্রীনগর সরকারি আব্দুল হাই খান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৯৭৪) সরকারিকরণ করা হয়। তবে পুরনো এ দুটি থানার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যে সমতা না থাকলেও ২০২৫ সালে উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের প্রচেষ্টায় ‘ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়’ (স্থাপিত ১৯২৫) সরকারিকরণের মাধ্যমে এ দুটি পুরনো থানার মধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সমতা আনয়ন হলো।
বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৮ টি। মুন্সিগঞ্জ সদর ২ টি, গজারিয়ায় ১ টি, টঙ্গিবাড়ী ১ টি, সিরাজদিখান ১ টি, লৌহজং ১ টি ও শ্রীনগর ২ টি।
ষোলঘর গ্রামটি খুবই প্রসিদ্ধ। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম এ গ্রামে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম বাঙালি প্রধান বিচারপতি চন্দ্রমাধব ঘোষ (১৮৩৮-১৯১৮) এ গ্রামের খ্যাতি সারা ভারতবর্ষ থেকে সুদূর লন্ডনে ছড়িয়ে দেন।
ইংরেজ সময়কালে এ গ্রামে তিনটি হাই স্কুল ও একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ষোলঘর হাই ইংলিশ স্কুল, চন্দ্রমাধব ঘোষ হাই ইংলিশ স্কুল ও অক্ষয় কুমার শশী কুমার হাই ইংলিশ স্কুল। এছাড়াও ষোলঘর বালিকা বিদ্যালয় নামে একটি মিডল স্কুল ছিল। ১৯২০ সালের পূর্বে চন্দ্রমাধব ঘোষ হাই ইংলিশ স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষাবিদ অক্ষয়কুমার বসু ষোলঘর হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি বিদ্যালয়টিকে কোন রকম টিকিয়ে রেখেছিলেন। শ্যামসিদ্ধি গ্রামের শিক্ষানুরাগী ও জমিদার নিজ গ্রামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠানও বেশি দিন ভালোভাবে চালানো সম্ভব হলো না। তাই ১৯২২ সালে শ্যামসিদ্ধি গ্রামের শশীকুমার আর অক্ষয়কুমার মিলে দুটি স্কুলের সমন্বয় ঘটিয়ে স্থাপন করেন ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়টি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ হতে সরকারিকরণ করা হয়েছে। এখন থেকে বিদ্যালয়টির নাম ‘অক্ষয় কুমার শশী কুমার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। এ বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের মধ্য দিয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হলো ৮ টি।
ষোলঘর গ্রামে এ বিদ্যালয়টি ছাড়াও ষোলঘর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে আরো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তবে এ বিদ্যালয়টি আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজ সময়কালে প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৪৪ সালের পূর্বেই বন্ধ হয়ে যায়।
মুন্সিগঞ্জ জেলায় বর্তমান মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৩৯ টি। এর মধ্যে বেসরকারি ১২৬ টি, সরকারি ৮ টি ও আপগ্রেড প্রাইমারি স্কুল ৫ টি। ১৩৯ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে বেসরকারি বিদ্যালয় ১২৬ টি। সরকারি ৮ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪ টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয় ২০১৮ সালে সরকারি নিবার্হী আদেশে।
মুন্সিগঞ্জ জেলার আয়তন ১০০৪.২৯ বর্গ কি.মি.। এখানে বেসরকারি পর্যায়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১২৬ টি, এতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৭ হাজার ৯৯০ জন। এতো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও সরকার এদিকে আন্তরিক না হওয়ায় ঠিকমতো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যয়ও হচ্ছে দ্বিগুণ। যদি সরকার গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারিকরণ করতো তাহলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই সমান সুযোগ পেতো।
ইংরেজ সময়কাল থেকে শিক্ষা-দীক্ষায় মুন্সিগঞ্জ সমগ্র ঢাকা জেলায় এগিয়ে থাকলেও এখন আর মুন্সিগঞ্জের অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নেই! শুধু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা আর পরিচর্যার কারণে দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে এ জেলা। যারা জেলাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশেষ করে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজ-তাঁরা যদি এগিয়ে আসেন তবেই এ জেলাকে আবার সেই গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে নেওয়া সম্ভব। ফলে এভাবেই এগিয়ে যাবে মুন্সিগঞ্জ, এভাবেই এগিয়ে যাবে বিক্রমপুর। আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।
ধন্যবাদ জানাই বর্তমান সরকার ও মুন্সিগঞ্জের দু’জন উপদেষ্টাকে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে স্বল্প সময়ের মধ্যে ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণ হলো। অভিনন্দন ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়কে এবং এ বিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্টদের। যারা অতীতের ন্যায় এ অঞ্চলের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। আর এভাবেই এগিয়ে যাবে মুন্সিগঞ্জের শিক্ষা, শিল্প, ইতিহাস আর সাহিত্য। যা অতীতের ন্যায় বর্তমান মুন্সিগঞ্জকে সবার কাছে পরিচিত করবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।




