বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান: সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান- একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক সত্যেন সেন
21

মুন্সিগঞ্জ, ৭ আগস্ট ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, প্রগতিশীল সাহিত্যিক, শ্রমিক-সংগঠক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সত্যেন সেন। বিক্রমপুরের মাটি থেকে উঠে আসা এই কৃতিমান ব্যক্তি আজও স্মরণীয় তাঁর আপসহীন আদর্শ, মানুষের অধিকারের পক্ষে আজীবন সংগ্রাম এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য। তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না; ছিলেন সত্য, ন্যায় ও সাম্যের এক নির্ভীক সৈনিক।

১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার) সোনারং গ্রামে এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সত্যেন সেন। বাবা ধরনীমোহন সেন এবং মা মৃণালিনী সেন। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘লস্কর’। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। পরিবারের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশই তাঁর চিন্তা ও মননের ভিত্তি গড়ে দেয়। তাঁর কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য এবং আরেক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক।

প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার ও গৃহশিক্ষকের কাছে শেষ করে ১৯১৯ সালে তিনি সোনারং হাই স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। ১৯২৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান। সেখানে এফএ ও বিএ সম্পন্ন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এমএ-তে ভর্তি হলেও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। তবে জেলেই বসে তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ সম্পন্ন করেন।

বিপ্লবের পথে সংগ্রামী জীবন

কলেজে পড়াকালীন তিনি বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩১ সালে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন এবং বহরমপুর বন্দি ক্যাম্পে তিন মাস কারাবন্দি থাকেন। ১৯৩৩ সালে আবারও ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে ছয় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৩৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর শান্তিনিকেতন থেকে গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন।

১৯৪২ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে কৃষক সমিতির মাধ্যমে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন।

ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান আমলেও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ কারাবাসে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর চোখে জটিল রোগ দেখা দেয়। কারাগারেই তিনি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের আদর্শকে আজীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে না পারলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। চোখের চিকিৎসার জন্য সে সময় তাঁকে মস্কোতে পাঠানো হয়। সেখানেই তিনি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংবাদ শুনে আবেগাপ্লুত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আবারও সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন।

উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অগ্রদূত

১৯৬৮-৬৯ সালে রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘উদীচী’। সংগঠনটি ভাষা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সাম্যের চেতনায় দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পরও উদীচীকে পুনর্গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সাহিত্য, গান ও সাংবাদিকতায় অনন্য অবদান

সত্যেন সেন বিশ্বাস করতেন, গান মানুষের চেতনাকে সবচেয়ে দ্রুত জাগিয়ে তুলতে পারে। তাই তিনি কৃষক-শ্রমিকের জীবনসংগ্রাম, শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সাম্যের স্বপ্নকে গান ও কবিগানের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর রচিত ‘চাষি দে তোর লাল সেলাম, তোর লাল নিশানারে’ গানটি একসময় কৃষক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

তিনি ছিলেন একজন আপসহীন সাংবাদিকও। দৈনিক মিল্লাত এবং পরে দৈনিক সংবাদ-এ সাংবাদিকতা করেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত সত্যের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। তাঁর লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের অধিকার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন।

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

উপন্যাস, ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, শিশুতোষ সাহিত্য—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল স্বচ্ছন্দ পদচারণা। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ভোরের বিহঙ্গী, রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ, অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, আলবেরুনী, বিদ্রোহী কৈর্বত, মা, উত্তরণ এবং একুল ভাঙে ওকুল গড়ে। এছাড়া গ্রামবাংলার পথে পথে, মানবসভ্যতার উষালগ্ন, প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ, মসলার যুদ্ধ, জীববিজ্ঞানের নানা কথাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। শিশুদের জন্য তাঁর লেখা পাতাবাহারও বিশেষভাবে সমাদৃত।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৯ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

১৯৭৩ সালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতে চলে যান। শান্তিনিকেতনে দীর্ঘ চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লীতে তাঁর মৃত্যু হয়।

সত্যের প্রতি আজীবন অবিচল

সত্যেন সেনের সমগ্র জীবন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মুক্তির সংগ্রাম এবং সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে তিনি কখনো আলাদা করে দেখেননি; সবকিছুকেই মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিক্রমপুরের এই কৃতী সন্তান আজও নতুন প্রজন্মকে ন্যায়, সাম্য, মানবতা ও সত্যের পথে চলার প্রেরণা দিয়ে চলেছেন।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ