পদ্মাপাড়ে মুন্সিগঞ্জ নিয়ে যা যা বলে গেলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে পদ্মার দুইপারের যেসকল পরিবার ভূমি অধিগ্রহনের স্বীকার হয়েছেন তাদের কথা চিরজীবন মনে রাখবেন বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি এসময় আরও বলেন, ‘আমরা যানি, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর ও লৌহজং অনবরত ভাঙ্গতে থাকে। যে বালুমহল আছে সেগুলো বিভিন্ন সময়ে আমরা পরিবর্তনের নির্দেষও দিয়েছি। তাছাড়া ভাঙন যাতে না হয় সেটার জন্য আমরা বিভিন্ন প্র্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন বিগ্রেডিয়ার এর অধিনস্থ ২০ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন কে জরুরী প্রতিরক্ষামূলক কাজে দায়িত্ব দেই। সে কাজগুলো তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শেষ করেছে।
১৪ অক্টোবর রবিবার মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা সেতুর নামফলক ও রেল সংযোগ উদ্বোধন শেষে এক সুধি সমাবেশে দেশের অন্যতম বড় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তিতে পড়ার কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
প্রায় ৩৫ মিনিট বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে বক্তব্য রাখেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও সেনা প্রধান আজিজ আহমেদ।
মঞ্চে ছিলেন মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান।
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া জটিলতার প্রসঙ্গটি আবারও তোলেন।
তিনি বলেন, শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ম অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব ব্যাংকসহ পশ্চিমা বিশ্বের কিছু নেতা পদ্ম সেতু নির্মাণে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নের কথা থাকলেও সংস্থাটি দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললে তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে সরকার বিশ্ব ব্যাংককে বাদ দিয়েই কাজটি শুরু করে।
পদ্মায় বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন আটকাতে মুহাম্মদ ইউনূসের ‘ষড়যন্ত্র’ ছিল বলে প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন।
মাওয়ার সমাবেশে তিনি আবারো সেই প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমি সমর্থন দিয়েছি। গ্রামীণ ফোনের লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে দরিদ্র মানুষের জন্য সেই টাকা ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু ফোনের কোনো লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংক পায়নি।
“আইন অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির বয়সসীমা ৬০ বছর হলেও ড. ইউনূসের বয়স ৭০ বছর হয়ে গিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো এমডি পদ ছেড়ে দিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যেন গ্রামীণ ব্যাংকে থাকেন। কিন্তু তিনি সেটা না মেনে সরকার ও বাংলাদেশে ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে দিলেন।”
ড. ইউনূস প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “কোনো অনুমোদন ছাড়াই এমডি ছিলেন এবং সরকারি বেতনও নিতেন। এটা সম্পূর্ণ ইলিগাল। তাকে আমরা কখনও অসম্মান করতে চাইনি। অর্থমন্ত্রী ও গওহর রিজভী ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে তাকে এমিরেটাস অ্যাডভাইজার করার প্রস্তাব দেন। তিনি রাজি না হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করলেন দুইটা। একটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরেকটা সরকারের বিরুদ্ধে। কোর্ট চাইলে সেই বেতন ফেরত নিতে পারত।”
এমডি পদ হারিয়ে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আটকানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাও আবার বলেন প্রধানমন্ত্রী।
“হিলারি ক্লিন্টন তাকে এমডি রাখতে ফোন করেন। টনি ব্লেয়ার ছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী । তার স্ত্রী শেলি ব্লেয়ার ফোন করলেন। মামলায় তিনি হেরে গেলেন। পশ্চিমা দেশের অনেক রাষ্ট্রদূত এসে আমাকে হুমকি দিত। ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যংক থেকে সরানো হলে পদ্মা সেতু হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।”
পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল সে প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ওয়ার্ল্ড ব্যাংক পদ্মাসেতুর টাকা বন্ধ করে দিয়েছিল, যার পেছনে ছিলেন ড. ইউনূস।
“তারা দুর্নীতির অভিযোগ তুলল, আমি বললাম আমি প্রমাণ চাই। তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। আমার বিরুদ্ধে, আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বার বার তারা তদন্ত করল। কিন্তু কোনো প্রমাণ পেল না। স্টেট ব্যাংক আমার ছেলে জয়কে তিনবার ডেকে নিয়ে শাসিয়েছে। এটা নিয়ে মামলা হয়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি। সমস্ত অভিযোগ ভুয়া, মিথ্যা। কোনো দুর্নীতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।”
তিনি বলেন, “জনগণের ওপর আমার ভরসা ছিল। সেই ভরসা নিয়েই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। অনেক বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করতে হয়েছে।নিজস্ব অর্থায়নে করছি। কিন্তু এর পেছনে যে অপমান যে নির্যাতন আমাদেরকে ভোগ করতে হয়েছে, এর পেছনে দেশের কিছু লোক জড়িত। যারা গরীবকে টাকা দিয়ে সুদ খায় তারা এর চেয়ে বেশি কী করতে পারে?”
প্রধানমন্ত্রী সকালে হেলিকপ্টারে করে মাওয়ার দোগাছির পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়ার-১ এর মাঠে অবতরণ করেন। এরপর গাড়িতে যান সেতু এলাকায়।
মাওয়া থেকে গিয়ে বিকালে মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে জনসভায়ও ভাষণ দেন তিনি।
২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ৭ নম্বর খুঁটিতেই পাইল স্থাপনের কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে মূল সেতুর কাজের উদ্বোধন করেছিলেন।
পদ্মা সেতুর ৪২টি খুঁটিতে ৪১টি স্প্যান বসবে। এর মধ্যে ১৪টি খুঁটি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। আর নদীতে ১৮০টি পাইল স্থাপন করা হয়েছে।









