সারাদেশে আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী মুন্সিগঞ্জের মেয়ে আজমেরী হক বাঁধন
মুন্সিগঞ্জ, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
মডেলিং দিয়ে পথচলা শুরু। এরপর টেলিভিশন নাটক, সিনেমা আর ওয়েব কনটেন্টে নানা চরিত্রে অভিনয় করে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। তবে অভিনয়ের বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সরব অবস্থানের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঁধনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা আলোচনা।
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের সঙ্গে পারিবারিক শিকড়ের সম্পর্ক থাকা এই অভিনেত্রী এখন আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। এবার কারণ ইতালির ভেনিসে তাঁর ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ। ঘটনাটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আলোড়ন তোলেনি, গড়িয়েছে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত।
২০০৬ সালে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিনোদন অঙ্গনে পরিচিতি পান বাঁধন। এরপর মডেলিং ও অভিনয়ে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় তাঁকে।
দন্ত চিকিৎসায় পড়াশোনা করা বাঁধন ধীরে ধীরে নিজেকে শুধু গ্ল্যামারনির্ভর অভিনেত্রী হিসেবে আটকে রাখেননি। সময়ের সঙ্গে বেছে নিয়েছেন চ্যালেঞ্জিং ও ব্যতিক্রমী চরিত্র।
বড় পর্দায় তাঁর অভিনয়যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পরিচালনায় নির্মিত সিনেমাটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আন সার্টেন রিগার্ড’ বিভাগে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়।
এরপর ভারতীয় নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ এবং বিশাল ভরদ্বাজের ‘খুফিয়া’র মতো কাজেও দেখা গেছে তাঁকে। ফলে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন বাঁধন।
বাঁধনের সাম্প্রতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় তাঁর অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় ইতালির ঘটনাটিও নতুন করে রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
চলচ্চিত্রসংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইতালিতে গিয়েছিলেন বাঁধন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি পার্কে অবস্থানকালে একদল বাংলাদেশিদের দ্বারা তিনি হেনস্তার শিকার হন।
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে বাঁধন নিজেই ঘটনার বর্ণনা দেন। বলেন, তাঁকে লক্ষ্য করে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছোড়া হয়, শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় এবং তাঁর মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় আসে। ভিডিওতে হামলাকারীদের একজনকে বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ ও ‘দেশদ্রোহী’ বলে সম্বোধন করতে দেখা যায়।
সংসদে উঠল বাঁধনের প্রসঙ্গ
ইতালির ঘটনাটি এবার পৌঁছে গেছে জাতীয় সংসদে। আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী বিষয়টি সংসদের নজরে আনেন।
তিনি বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইতালি সরকারের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ জানতে চান।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ঘটনাটিকে ‘অমার্জনীয়’ ও ‘নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় অপরাধের নির্মমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এবং বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য সংসদ শুনতে চায়।
পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সংসদে জানান, ঘটনাটি নিয়ে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা এবং বাঁধনকে সর্বোচ্চ কনস্যুলার সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে ঘটনাটিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
সরকারের অবস্থানও কঠোর
বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, ইতালিতে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বাঁধনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাঁকে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আক্রমণ করে এবং তাঁকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্লোগান দিতে চাপ দেয়। এ বিষয়টিও ঘটনার রাজনৈতিক মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
ঘটনার পর বাঁধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের মানুষ।
কেন আবার এত আলোচনায় বাঁধন?
বাঁধনকে ঘিরে আলোচনার পেছনে শুধু সাম্প্রতিক হামলাই নেই। তাঁর ক্যারিয়ার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে সরব অবস্থান—সবকিছু মিলেই তিনি এখন বাংলাদেশের আলোচিত শিল্পীদের একজন।
‘রেহানা মরিয়ম নূর’ তাঁকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন পরিচয় দিয়েছে। ‘খুফিয়া’র মতো কাজ তাঁকে দেশের বাইরের দর্শকের কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। আবার বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে তিনি কখনো প্রশংসিত, কখনো সমালোচিত হয়েছেন।
ফলে ইতালির হামলার ঘটনা যেন তাঁর দীর্ঘদিনের আলোচিত অবস্থানকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিনোদন অঙ্গনে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়া বাঁধনের পারিবারিক শিকড় মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘরে। তার পিতা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। বিক্রমপুরের এই জনপদের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের কারণে স্থানীয় মানুষের কাছেও তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
দেশের একজন অভিনেত্রী যখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচা থেকে শুরু করে সংসদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের নামটিও নতুন করে সামনে আসে।
একসময় লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে তরুণী বিনোদন জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে সেই আজমেরী হক বাঁধন এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ।








