১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
শুক্রবার | রাত ১১:০৫
সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের বিরুদ্ধে ‘মব-ভায়োলেন্স’, দায় সরকারকেই নিতে হবে: শিহাব আহমেদ
খবরটি শেয়ার করুন:
239

মুন্সিগঞ্জ, ২৩ মে ২০২৫, (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের আলোচিত লঞ্চ কাণ্ডের ঘটনা থেকে আমার বিরুদ্ধে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে ‘মব-ভায়োলেন্স’ উস্কে দেয়ার সর্বাত্মক একটি চেষ্টা সক্রিয় রয়েছে। সংঘবদ্ধ দলটি আমাকে পেশাগত কাজ থেকে নীরব করার জন্য বা ভয় দেখানোর জন্য শারীরিক বা মৌখিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য- আমার স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া।

চক্রটি আমার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অতীত সামনে এনে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অভিযোগ এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ভিত্তিতে ‘ট্যাগিং’ করে আমাকে নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন অনলাইন পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে রেখেছে। এ বিষয়ে আমার অবস্থান ও বক্তব্য পাঠকের জানার আগ্রহ রয়েছে বলে মনে হয়েছে।

গত ৯ মে শুক্রবার রাতে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে যাত্রাবিরতি করা ‘এমভি ক্যাপ্টেন’ নামক একটি যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে ‘পিকনিকে’ আসা অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রকাশ্যে বেল্ট দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। যে যুবককে এ ঘটনায় জড়িত থাকতে ভিডিওতে দেখা গেছে সেই নেহাল আহমেদ জিহাদকে ঘিরে থাকা ‘উপভোগকারী’ পক্ষের থেকে বিষয়টি ‘ন্যায্য’ মনে করে ‘মারধরের ভিডিও’টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এবং সেদিন রাতেই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরদিন ১০ মে শনিবার সকাল ১০ টার দিকে ‘মুন্সিগঞ্জে যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে ‘পিকনিকে’ আসা নারীদের প্রকাশ্যে মারধর-লুটপাট’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে আমার বিক্রমপুর। যেখানে ভিডিওতে থাকা যুবক, প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক, ঘটনাস্থলে থাকা থানা পুলিশ ও নৌ পুলিশের বক্তব্য রয়েছে।

একইদিন দুপুর দেড়টার দিকে আমিসহ আরও ৩-৪ জন সাংবাদিক সদর থানা অভ্যন্তরে অপেক্ষা করাকালে নেহাল আহমেদ জিহাদকে বহনকারী থানা পুলিশের একটি গাড়ি থানা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। জিহাদ গাড়ি থেকে নেমে আমিসহ উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের ভিডিও সাক্ষাৎকার দেন এবং তিনি অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী বলে উল্লেখ করেন। দুপুর আড়াইটায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ‘মুন্সীগঞ্জে লঞ্চ টার্মিনালে তরুণীদের মারধর ও আসামী গ্রেপ্তার’ শিরোনামে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি সাংবাদিকদের সরবরাহ করা হয়। এর ভিত্তিতে দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে ‘মুন্সিগঞ্জে লঞ্চের নারী যাত্রীকে প্রকাশ্যে মারধর: ভাইরাল যুবক গ্রেপ্তার’ শিরোনামে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার বিক্রমপুর।

একইদিন বিকাল পৌনে ৪টার দিকে আমি মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে পেশাগত কাজ করাকালীন ২টি মোটরসাইকেলে করে ৪ জন যুবক আসেন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাদের মধ্যে হাফ প্যান্ট পরিহিত মারুফ মোল্লা নামের একজন আমার পাশে বসেন এবং ‘লঞ্চে নারীদের মারধরের ঘটনায় গ্রেপ্তার’ জিহাদ সম্পর্কিত প্রকাশিত সংবাদের ভাষা ও শব্দপ্রয়োগ নিয়ে আমার কাছে ১৩ মিনিট যাবৎ বিভিন্ন আপত্তি করেন ও শাসাতে থাকেন। সাথে থাকা বিপ্লব ও সিয়াম সামি নামের ২ যুবক পেছন থেকে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করেন। রাতে মারুফ মোল্লাকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে তাকে আমার মধ্যস্থতায় দেয়া হয় পরিবারের জিম্মায়।

গত ১৬ মে শুক্রবার আমার ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ‘মিথ্যা সংবাদ প্রচার, হয়রানি মূলক কর্মকাণ্ড, অবৈধ গ্রেফতার এবং হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে ঘোষণা দেন সিয়াম সামি নামের যুবক। যার বিরুদ্ধে ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহরে ছাত্রহত্যায় ‘অস্ত্রধারী’ অবস্থানের প্রমাণ রয়েছে এমন একজন ছাত্রলীগ নেতা (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সাজ্জাত হোসেন সাগরের সাথে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া মানববন্ধনে অংশ নেয়া আরও এক যুবককে চিহ্নিত করা গেছে যার সাথে সাজ্জাত হোসেন সাগরের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

 

৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহরে ‘অস্ত্রধারী’ অবস্থান নেয়া সাজ্জাত হোসেন সাগরের জন্মদিন উদযাপনে সিয়াম সামি। ছবি: সংগৃহীত।

 

মানববন্ধনে অংশ নেয়া গোলচিহ্নিত যুবককে দেখা গেছে উপরের সাজ্জাত হোসেন সাগরের জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠানের ছবিতেও। ছবি: সংগৃহীত।

 

আমার বিরুদ্ধে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তব্য সম্বলিত পোষ্টটি শেয়ার করেছেন জুলাই হত্যা মামলার পলাতক আসামি, মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফয়সাল মৃধা।

জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফয়সাল মৃধা কতৃক আমার বিরুদ্ধে ‘মব-ভায়োলেন্স’ উস্কে দেয়া গোষ্ঠী কতৃক প্রচারণা শেয়ার করেছেন- এসব চিত্র এটাই প্রমাণ করে এই সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীটি পতিত সরকারের সমর্থক, নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কিছু লোক দ্বারা প্রভাবিত।

মানববন্ধনে ‘শিহাব আহমেদের নিবন্ধন বাতিল’ বা তিনি যদি প্রেসক্লাবের সদস্য হন তাকে বিতাড়িত করার দাবি করা হয়েছে। তাদের আকাঙ্খা হচ্ছে- আমার বিক্রমপুরকে সর্বমহল থেকে পরিত্যাগ করতে হবে। যাতে পত্রিকাটি সঙ্কটের মুখে পতিত হয় এবং নিজেরাই কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় অথবা ইত্যাদি।

‘যদি প্রশাসন এই দাবি না মানে, আমরা তাদের বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নামব। প্রশাসন যদি ‘আমার বিক্রমপুর’ কিংবা হলুদ সাংবাদিকতাকে সমর্থন করে, তবে আমরা মনে করব প্রশাসনও তাদের দালাল।’- মানববন্ধনে বক্তব্যে বলেন শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ আহসান আকাশ।

মানববন্ধনে দাবি করা হয় ‘সাংবাদিকতার নৈতিকতার বাইরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সকল সাংবাদিককে দ্রুত অপসারণ করে প্রেসক্লাবের সংস্কার করতে হবে।’

তাদের এই দাবিটি যৌক্তিক এবং ন্যায্য। সরাসরি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থেকে, পদ-পদবী বহন করে পাশাপাশি সাংবাদিকতা করা উচিৎ নয়। এতে পেশার মর্যাদাহানি হয়। নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। মুন্সিগঞ্জ জেলার অনেক সাংবাদিক এখনো দলীয় পদ বহন করছেন, তাদের যে কোন একটি ধরে রাখা উচিৎ। এ বিষয়ে আমার অবস্থান কঠোর। যা সর্বমহলে স্বীকৃত। এ কথা সত্য যে, আমি ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির আগে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু সাংবাদিকতা করার অভিপ্রায়ে ঘোষণা দিয়ে জেলা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ‘দপ্তর সম্পাদক’ পদটি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি এবং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করি। এর ৭ বছর আগে ২০১৫ সাল থেকে আমি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত আছি।

২০২২ সালে ছাত্রলীগ থেকে আমার পদত্যাগপত্র ও পরবর্তী প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

‘প্রেসক্লাবের সদস্য’ হওয়া বা না হওয়া নিয়ে আপত্তির বিষয়টি অজ্ঞতাপ্রসূত। সাংবাদিকতার জন্য প্রেসক্লাব বা কোন সংগঠনের সদস্য হওয়ার বাধ্যবাধকতা আমাদের দেশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও নেই। পাশাপাশি প্রেসক্লাব থেকে কাউকে বিতাড়িত করার ক্ষমতাও কারোর নেই। এটি কোন ব্যক্তিগত সংগঠন নয় বা একে কুক্ষিগত করে রাখার অধিকারও কেউ বহন করেন না। তবে কিছু মানদণ্ডের মাপকাঠি রাখা হয়েছে সাংবাদিকতার স্বার্থেই। যেটি ইতিবাচক। তবে, বর্তমান কমিটিতে সেসব লঙ্ঘনকারী একাধিক সদস্য রয়েছেন। প্রণীত গঠণতন্ত্র অনুসরণ করলেই এ আলোচনার ইতি ঘটতে পারে। সেই উদ্যোগ প্রেসক্লাবের নেয়া উচিৎ।

মুন্সিগঞ্জ শহরেই ‘মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাব’, ‘মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাব’, মুন্সিগঞ্জ জেলা অনলাইন প্রেসক্লাব’, ‘মুন্সিগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন’ নামে ৪টি সংগঠনসহ আরও একাধিক সাংবাদিকদের সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনে অন্তত ২০০ জন সাংবাদিক রয়েছেন। আমিসহ অনেক প্রথম সারির গণমাধ্যমকর্মী এর কোনটিরই সদস্য নন। বরংচ উন্নত দেশগুলোতে এভাবে সংগঠন করে ‘সিন্ডিকেট সাংবাদিকতা’কে নিরুৎসাহিত করা হয়।

আমার বিক্রমপুর কোন ‘মিথ্যা সংবাদ প্রচার’ করলে তার বিরুদ্ধে গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতে পারে। সংবাদটির কোন কোন অংশে আপত্তি রয়েছে জানিয়ে ই-মেইলে ‘প্রতিবাদ’ জানানো যেতে পারে। প্রয়োজনে প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করা যেতে পারে। কোন ‘হয়রানি মূলক কর্মকাণ্ড’ যদি মনে হয়ে থাকে সেটিও একইভাবে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ায় জানানো যেতে পারে। কিন্তু ‘অবৈধ গ্রেফতার’ এবং ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র অভিযোগটি প্রত্যাখান করতে হচ্ছে। কারণ কোন বিষয়ে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং আমার বিক্রমপুর কয়েকটি উৎসের ‘মন্তব্য’ ও দৃশ্যমান উপাদান ছাড়া প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি।

আমার সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেয়ার আহবান জানানো অথবা প্রশাসনের কাছে আমার বিক্রমপুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানোর ফলে এক ধরনের উত্তেজনা ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা ‘মব-ভায়োলেন্স’ এর সাথে সাদৃশ্য।

জুলাই আন্দোলনচলাকালীন মূল ধারার সাংবাদিকদের চেয়ে বেশি ভূমিকা ছিলো আমার বিক্রমপুরের মত নাগরিক সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্মগুলোর। যা নিয়ে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও বর্তমান এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম তার অবস্থান জানিয়েছেন।

‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিটি মুহূর্তে গণমানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রামাণ্য দলিল তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন আমাদের নির্ভীক সাংবাদিকরা। দায়িত্বের টানে সব ঝুঁকি উপেক্ষা করে ফ্রন্টলাইনে ছিল তাঁদের সাহসী উপস্থিতি।’ -নাহিদ ইসলাম, ৩০ জানুয়ারি ২০২৫।

ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে মব ভায়োলেন্সের উস্কানি দেয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বিগত সরকারের আমলে ‘মুন্সিগঞ্জে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসার মূলহোতা কারা?’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০১৯ সালে আমার বিরুদ্ধে ‘নিপীড়নমূলক’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছিলো আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক একটি পক্ষ। তবে মামলা থেকে ২০২৩ সালের ১৭ মে আমাকে অব্যাহতি দেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জুলফিকার হায়াত।

আওয়ামী লীগ সময়ে এমন একটি পরিবেশ ছিলো- যেখানে কারও সাংবাদিকতা পছন্দ না হলেই তার বিরুদ্ধে একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেয়া ও মামলার হুমকি দেয়া স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো। বর্তমান ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই প্রচলন না থাকলেও একটি সুযোগসন্ধানী ও সরকারের সমর্থক গোষ্ঠী দাবিদার সংঘবদ্ধ চক্র কর্তৃক ‘মব ভায়োলেন্স’ সৃষ্টি করে মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাঁধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমাকে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে আমি বসা অবস্থায় আমার পাশে একটি পলিথিনের ভেতর কিছু ফেনসিডিলের খালি বোতল রেখে দেয়া হয়েছে এরকম একটি ছবি আমার বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে। এই ছবিটিও ব্যবহার করা হয় মূলত আমার সাংবাদিকতা রুখে দেয়ার পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য থেকে।

মূলত ২০১৬ সালে তৎকালীন মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করছেন শিপন পাটোয়ারি নামের এক যুবলীগ নেতা-এরকম একটি ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার বিক্রমপুর। ওই সংবাদ প্রকাশের জেরে ঘটনার কয়েকদিন পর হরগঙ্গা কলেজ ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সভাপতি নিবির আহমেদের নির্দেশে আমাকে অস্ত্রের মুখে মুন্সিগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায় গণকপাড়া এলাকার যুবলীগ নেতা ইমরান হোসেন ইমু। পরে আমাকে জিম্মি করে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের পেছনে ছাত্রাবাসের পাশে ‘হরগঙ্গা কলেজ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ’ এর সামনে নিয়ে মারধর করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ না করার শর্তে ওই ছবিটি তুলে রাখে। কিন্তু তাদের আবদার না রাখতে পারায় ছবিটি তারা বিভিন্নসময় আমার বিরুদ্ধে প্রচারণায় ব্যবহার করে।

অস্ত্রধারী যুবলীগ নেতা শিপন পাটোয়ারী। সেসময় এই ছবিটি প্রকাশ করে আমার বিক্রমপুর।

সেসময়কার পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান পুরো ঘটনাটি জানতেন এবং আমাকে ‍তুলে নিয়ে ছবি তুলে রাখার পরই ২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ছাত্রাবাসের কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নিবিরের রুমে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে পুলিশ।

জিয়া হলের ২০৫ নং কক্ষ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।

বিশ্বজুড়ে অনলাইন সাংবাদিকতা বা ডিজিটাল সাংবাদিকতা তদুপরি নাগরিক সাংবাদিকতার পরিসর আরও বিস্তৃত হচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতা যখন সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে জুলাই-আগস্টে অনেক সংবাদই চেপে যেতে বাধ্য হয়েছে, কিংবা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে তখন নাগরিক সাংবাদিক বা এ ধরনের উন্মুক্ত সাংবাদিকতার প্ল্যটফর্মগুলোর বড় একটি ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিলো সেসময় ‘আক্রমণের মুখে থাকা’ পক্ষ, দেশ ও প্রবাসের পাঠক-দর্শকদের কাছে। যা বর্তমান সরকারের সকল পক্ষের কাছ থেকেই স্বীকৃত বিষয়।

হামলা ও আক্রমণের ভয় থাকলেও আমার বিক্রমপুর কিংবা আমি জুলাই আন্দোলনে কোন সংবাদ প্রচারে পেশাগত দায়িত্বের অবহেলা করিনি। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যে কয়টি কর্মসূচি হয়েছে মুন্সিগঞ্জে তার সবকয়টি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে, মাঠে থেকে সংগ্রহ, কনটেন্ট ও সচিত্র আকারে প্রচার করেছে আমার বিক্রমপুর। লাইভগুলো করেছি আমি নিজে উপস্থিত হয়ে, যা এখনো রয়েছে পেজে এবং আমার সংগ্রহে। জেলার ৪টি সংগঠনের যে ২০০ সাংবাদিকের কথা বলেছি, যে চিহ্নিত উস্কানিদাতা সাংবাদিকদের কথা উল্লেখ করেছি, তাদের কার কি অবস্থান ছিলো আন্দোলন চলাকালীন, কে কিভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন তা পর্যালোচনা করার এখনই যথাযথ সময়।

আমার করা লাইভগুলোর কিছু অংশ ভিডিওতে:  

কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক কারফিউ জারি, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হলেও সকল প্রতিবন্ধকতার উর্ধ্বে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের খবর এবং সঠিক খবর পাঠিয়েছি জাতীয় গণমাধ্যমেও।

 

 

১৯ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ভরসা ছিলো মোবাইল এসএমএস। একেকটি নিউজ কয়েক ভাগ করে এসএমএস করতে হয় ডেস্কে। পরদিন ২০ জুলাই যা ছাপা হয় জাতীয় পত্রিকা দৈনিক বাংলায়।

৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জে দিনব্যাপী আন্দোলন হয়েছে। সকাল থেকে লাইভ করেছে আমার বিক্রমপুর। দুপুরে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হলেও প্রেসক্লাবের ওয়াইফাই ব্যবহার করে লাইভ হয়েছে। আমার বিক্রমপুরের প্রতিটি লাইভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ৪০-৫০ লাখ মানুষ মুহুর্তেই দেখেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ‘কমিউনিটি গাইডলাইনে’র অযুহাতে ফেসবুক সরিয়েও দিয়েছে। প্রতিটি লাইভ ৪-৫ হাজার শেয়ার হয়েছে। লাইভ দেখে ওইদিন মুন্সিগঞ্জের আন্দোলনের খোঁজখবর নিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ।

বর্তমানে আমি এবং আমার গড়ে তোলা ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘আমার বিক্রমপুর’কে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা, সংঘবদ্ধভাবে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে রেখে চাপ সৃষ্টি করা স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যা বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক।

৩ আগস্ট আমার ব্যক্তিগত আইডি থেকে দেয়া একটি পোস্ট।

একজন সাংবাদিকের কাছে এ বিষয়টি লজ্জাজনক যে, তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন, বিবেকবোধের জায়গা থেকে অবস্থান নিয়েছেন এবং তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন। এই পরিবেশ মোটেও স্বাভাবিক নয়। এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য জুলাইতে বিবেকবোধ সম্পন্ন সর্বসাধারণ মানুষ জাগ্রত হয়নি, মানুষ বিনা দ্বিধায় প্রাণ দেয়নি। রিকশাচালক-দিনমজুর, শিল্পী-বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক-শিক্ষক এক কাতারে নেমে আসেনি। ভবিষ্যতে সৃষ্ট যে কোন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের ঝুঁকি নেয়াকে নিরুৎসাহিত করবে- আমার বিরুদ্ধে মুষ্টিমেয় লোকের স্বার্থদ্বন্দে সৃষ্ট ‘মব-ভায়োলেন্স’ উস্কে দেয়ার এই পরিবেশের ফলে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ নিয়ে অনেক প্রশংসনীয় কথা সরকারের পক্ষ থেকে গত কয়েকমাসে বলা হয়েছে। তবে সেই কথাগুলো প্রমাণ করতে ‘মব-ভায়োলেন্স’ উস্কে দেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর না হলে সরকারের অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হবে। এ বাক্য তখনই উচ্চারিত হচ্ছে যখন দেখা যাচ্ছে লঞ্চকাণ্ডে ভাইরাল যুবক ছাড়া একই ঘটনায় জড়িত অন্যরা ‘সরকারের সমর্থক গোষ্ঠী’ দাবিদার হওয়ায় নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের আইনের আওতায় আনতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

‘মব-ভায়োলেন্স’ ঘটিয়ে গণমাধ্যমকর্মী বা গণমাধ্যমের প্রতি আক্রমণ অব্যাহত চলতে থাকলে ঘটনাগুলো বহির্বিশ্বে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. ইউনূসের ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করবে। গণমাধ্যম সূচকে উন্নতির চেষ্টা করা আর গণমাধ্যমকর্মী বা গণমাধ্যমের প্রতি ‘মব-ভায়োলেন্স’ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সহানুভূতিশীল আচরণ করা একসাথে চলতে পারে না। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

শিহাব আহমেদ: সম্পাদক ও প্রকাশক, আমার বিক্রমপুর। জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক বাংলা।