মুন্সিগঞ্জ ‘গ্রাম’ নয়, জমিদার-রাজাদের ইতিহাস সমৃদ্ধ- যে গর্ব বাংলাদেশের আর কারও নেই
মুন্সিগঞ্জ, ৬ জুলাই ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠান ঢাকা কাচ্চি ডাইন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণামূলক ওই ভিডিওতে মুন্সিগঞ্জকে ‘গ্রাম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভিডিওটি প্রকাশের পর মুহূর্তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন মুন্সিগঞ্জবাসী। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদকে অবমাননা করার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
অনেকেই মন্তব্য করেন, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে একটি জেলার শত শত বছরের ইতিহাসকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা শুধু অজ্ঞতাই নয়, বরং একটি অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত।
তবে এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে প্রতিষ্ঠান ঢাকা কাচ্চি ডাইন-এর বিরুদ্ধে অতীতের বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনাও।
২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম আজিমুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢাকা কাচ্চি ডাইন-এ অভিযান চালায়। অভিযানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বোরহানি উৎপাদন, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং ফ্রিজে রক্তমাখা মাংস সংরক্ষণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক ভিডিওতে মুন্সিগঞ্জকে ‘গ্রাম’ হিসেবে উপস্থাপন করায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— ইতিহাস না জেনে একটি জেলার পরিচয় বিকৃত করার নৈতিক অধিকার তাদের কোথায়?
মুন্সিগঞ্জ কি শুধুই একটি গ্রাম?
ইতিহাস বলে, না। মুন্সিগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র, জ্ঞানচর্চার ভূমি, জমিদার-রাজাদের স্মৃতিবিজড়িত জনপদ এবং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। ইতিহাসবিদদের মতে, বিক্রমপুরের ইতিহাস অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বছরের পুরোনো। একসময় এই বিক্রমপুরই ছিল বাংলার রাজধানী। বর্তমান সময়েও মুন্সিগঞ্জের মুন্সিয়ানা কম নয়। দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো ‘পদ্মা সেতু’ এ জেলার উপর দিয়ে। যার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ।
বাংলার শাসক রাজাদের রাজধানী
১১শ ও ১২শ শতকে সেন রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক রাজা বল্লাল সেন বিক্রমপুরকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর পুত্র লক্ষ্মণ সেন-ও এখান থেকেই বাংলা শাসন করতেন। অঞ্চলটি খ্রিস্টীয় দশ শতকের শুরু থেকে তেরো শতকের প্রথম পর্যন্ত পাল, চন্দ্র, বর্মন ও সেন রাজাদের রাজধানী ছিল। বিক্রমপুর (অধুনা মুন্সিগঞ্জ) এর জনপদের বয়স আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগের। মিশরে পাঁচ হাজার বছর আগের জনৈক রাজার মমিতে যে মসৃণ নীল বস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে অনুমানিকভাবে ধরা হয় সেটি বিক্রমপুর থেকেই তৈরি।
‘স খলু শ্রী বিক্রমপুর সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধবারাত’ (বিজয় অথবা রাজধানীর রাজকীয় স্থান যা মুন্সিগঞ্জে অবস্থিত)-রূপে শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসনে সর্বপ্রথম দেখা যায় এবং পরবর্তী বর্মন ও সেন রাজবংশের শাসনামলে এ মর্যাদা অব্যাহত ছিল। এমনকি সেনদের শাসনামলে, যাঁরা বলতে গেলে প্রায় সমগ্র বঙ্গের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন, মুন্সিগঞ্জ তাদের রাজধানী রূপে বলবৎ ছিল এবং নদীয়ায় বখতিয়ার খলজীর হাতে পরাজিত হওয়ার পর লক্ষ্মণসেন এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তার দুই পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন স্বল্পকালের জন্য এ অঞ্চল শাসন করেছিলেন।
অর্থাৎ যে ভূখণ্ডকে আজ কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত ‘গ্রাম’ বলছেন, সেই ভূখণ্ড থেকেই একসময় পুরো বাংলা শাসিত হতো।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজধানী
বিক্রমপুর শুধু রাজনৈতিক কেন্দ্রই ছিল না; এটি ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর-এর জন্মও এই বিক্রমপুরে। তিনি চীনের তিব্বতসহ সমগ্র বৌদ্ধ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃত। আজও তাঁর নাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
এছাড়া স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, অতীশ দীপঙ্কর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো বিশ্ববরেণ্য মহাপুরুষদের জন্ম এই মাটিতে। এখানেই জন্ম নিয়েছেন সরোজিনী নাইডু, সত্যেন সেন, ব্রজেন দাস’রা।
মুঘল আমলের গর্ব— ইদ্রাকপুর কেল্লা
ইদ্রাকপুর কেল্লা মুন্সিগঞ্জের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন। মুঘল সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০-এর দশকে জলদস্যু ও পর্তুগিজ আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য এই দুর্গ নির্মাণ করেন। চার শতাব্দী পেরিয়েও আজও দাঁড়িয়ে থাকা এই কেল্লা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
জমিদারবাড়ির জেলা
বাংলাদেশে এত বিপুলসংখ্যক ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি খুব কম জেলাতেই দেখা যায়। মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—
- কলমা জমিদারবাড়ি
- শ্রীনগরের যদুনাথ রায়ের জমিদারবাড়ি
- ভাগ্যকুলের জমিদারবাড়ি
- বলরাম বাড়ি, শ্রীনগর
- সেন বাড়ি, শ্রীনগর
- হাজড়া বাড়ি, দোগাছি
- দাসের বাড়ি, চাইনপাড়া, সিরাজদিখান
- মালখানগরের জমিদারবাড়ি (নয়া বাড়ি)
- বজ্রযোগিনী এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা
- আব্দুল্লাহপুর পাল বাড়ি
- মিরকাদিম নগর কসবা বাড়ি
- লৌহজং ও টংগিবাড়ীর বিভিন্ন প্রাচীন জমিদারবাড়ি
আর আধুনিক কালের কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি আর চির শান্তির কাঠ ও টিনের ঘরের সৌন্দর্য্য বাংলাদেশজুড়ে মুন্সিগঞ্জেই সেরা।
এসব স্থাপনা শুধু স্থাপত্য নয়, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
প্রত্নতত্ত্বেও সমৃদ্ধ বিক্রমপুর
মুন্সিগঞ্জের রঘুরামপুরে আবিষ্কৃত বিক্রমপুর বৌদ্ধ বিহার প্রমাণ করেছে, হাজার বছর আগে এখানেই গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নস্থল। রয়েছে ৫৪৩ বছরের পুরোনো বাবা আদম মসজিদ। আছে- সোনারং জোড়া মঠ, আউটশাহী জোড়া মঠ। উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ ও স্মৃতিস্তম্ভ সেটিও মুন্সিগঞ্জে- শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত শ্যামসিদ্ধির মঠ ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ। আনুমানিক ২৪৭ বছরের পুরোনো এই মঠের উচ্চতা প্রায় ২৪১ ফুট। রয়েছে পানাম পুলঘাটা খ্যাত মিরকাদিম সেতু।
শিক্ষায় দেশের পথপ্রদর্শক
মুন্সিগঞ্জকে অনেকেই বলেন ‘শিক্ষিত মানুষের জেলা’।
এই জেলা থেকে অসংখ্য শিক্ষক, বিচারপতি, সাহিত্যিক, গবেষক, প্রশাসক, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মুন্সিগঞ্জের মানুষের অবদান আজও উল্লেখযোগ্য।
একটি প্রচারণামূলক ভিডিওর জন্য কোনো জেলার পরিচয় বিকৃত করা দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
মুন্সিগঞ্জের মানুষ গ্রামকে ছোট করে দেখেন না। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই তাদের কাছে সম্মানের। কিন্তু ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা, যে জেলা একসময় বাংলার রাজধানী ছিল, যে জেলা রাজা-জমিদার, জ্ঞানী-গুণী এবং হাজার বছরের সভ্যতার ধারক— তাকে শুধুমাত্র ‘গ্রাম’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ইতিহাসের প্রতি অবিচার।
একটি জেলার পরিচয় নির্ধারণ হয় না কোনো ভাইরাল ভিডিও দিয়ে; তা নির্ধারণ করে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের অবদান।
আর সেই বিবেচনায়, মুন্সিগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়— এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়।









