জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: মুন্সিগঞ্জে পরিবর্তন আসলো কতটুকু?
মুন্সিগঞ্জ, ৬ আগস্ট ২০২৬, হাসনাত সায়ের (আমার বিক্রমপুর)
দুই বছর আগে জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলোতে মুন্সিগঞ্জের মানুষও রাজপথে নেমেছিল। ছাত্র, তরুণ, অভিভাবক, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই আন্দোলনে এই জেলার ১৬ জন সন্তান মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকায় প্রাণ হারান। তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু একটি সরকারের পতনের জন্য ছিল না; ছিল এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যাশায়, যেখানে নাগরিক সেবা সহজ হবে, প্রশাসন জবাবদিহিমূলক হবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনের শাসন বড় হবে এবং সাধারণ মানুষ ভয়মুক্তভাবে বাঁচতে পারবে।
দুই বছর পর প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—মুন্সিগঞ্জ কি সেই প্রত্যাশার পথে এগোতে পেরেছে?
এর উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। কারণ পুরো চিত্রটি সাদা-কালো নয়। কিছু ক্ষেত্রে আশার আলো জ্বলেছে, আবার বহু জায়গায় পুরোনো সংকট যেন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
স্বীকার করতেই হবে, দীর্ঘদিন আটকে থাকা কয়েকটি উন্নয়ন উদ্যোগে সাম্প্রতিক সময়ে গতি এসেছে। গজারিয়া উপজেলার ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ, বহু প্রতীক্ষিত মেঘনা সেতু প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার আলোচনা, মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক সংস্কারের কাজ এবং শহরের মোল্লারচর এলাকায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা—এসব মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা অন্তত একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা কি মানুষের জীবন বদলে দেয়?
একজন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি যেসব প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি হন, সেগুলো হলো হাসপাতাল, থানা, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস কিংবা আদালত। পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়নও সেখানেই।
মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের দিকে তাকালে এখনো বহু রোগীর অভিযোগ শোনা যায়—জটিল রোগীকে দ্রুত ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়ে গেছে, আর হাসপাতাল চত্বরে বেসরকারি ক্লিনিকের প্রতিনিধিদের বিচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা যেমন ছিল, বাস্তবতা এখনো ততটা আশাব্যঞ্জক হয়ে ওঠেনি।
পাসপোর্ট অফিসের চিত্র নিয়েও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। দালালচক্রের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমন কথা খুব কম মানুষই বলবেন। একইভাবে বিআরটিএর সেবা নিয়েও অনেক আবেদনকারীর অভিযোগ, হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত আইনশৃঙ্খলা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং ভুক্তভোগীদের একাংশের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গভীর রাতে বাড়ি থেকে মানুষকে তুলে আনার অভিযোগ শোনা যায়। আবার কেউ জামিন পাওয়ার পর অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার বা ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানোর ঘটনাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনগতভাবে এসব পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রতিটি মামলার বাস্তবতার ওপর নির্ভর করলেও, এ ধরনের অভিযোগ জনমনে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস তৈরি করছে। আইনের শাসনের মূল শক্তি হলো ন্যায়বিচারের দৃশ্যমানতা; সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রের প্রতিই মানুষের আস্থা কমে যায়।
আরও একটি বিষয় মানুষকে ভাবায়। নারীর প্রতি সহিংসতা বা নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান হওয়া উচিত—এটাই সমাজের প্রত্যাশা। কিন্তু অনেক সময় বিচার বিলম্বিত হওয়া বা অভিযুক্তদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়, অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান কতটা দৃঢ়।
উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা কম নয়। স্থানীয়ভাবে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের টেন্ডার ও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এমন প্রশ্নেরও অবসান ঘটবে।
রাজনীতির সংস্কৃতিও কি বদলেছে?
দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, পুরোপুরি নয়। দলীয় শক্তি প্রদর্শনের মোটরসাইকেল শোডাউন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতকে আক্রমণ, স্বাধীন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা কিংবা প্রশাসনের সাথে মিশে গিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—এসব আচরণ এখনো পুরোপুরি অতীত হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিরোধী মতকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার মধ্যে।
মুন্সিগঞ্জ একসময় রাজনৈতিক সহনশীলতার জন্য পরিচিত ছিল। এ জেলার মানুষকে ‘শান্তিপ্রিয়’ বলেই সবাই চিনত। সেই পরিচয় যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাজারো মানুষ রাজপথে নেমেছিল। আজ জনস্বার্থের ইস্যু—হাসপাতালের সেবা, যানজট, পরিবেশ ধ্বংস, নদী দখল, মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা নাগরিক দুর্ভোগ—এসব নিয়ে সেই জনসম্পৃক্ততা আর তেমন দেখা যায় না। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি থাকলেও নাগরিক অধিকারভিত্তিক আন্দোলন অনেকটাই নিস্তেজ।
ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারও গত দুই বছরে মুন্সিগঞ্জবাসীকে নতুন করে ভাবিয়েছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। শুধু সংকটের সময় নয়, সারা বছর সমন্বিত জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন—এই উপলব্ধিও এখন স্পষ্ট।
তবে সবকিছুর পরও আমি হতাশ হতে চাই না।
কারণ পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। দুটি বছর একটি জেলার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা সামাজিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অন্তত একটি স্পষ্ট বার্তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন ছিল—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক পরিচয় বড়, আর সরকারি সেবা হবে মানুষের অধিকার; কারও দয়া নয়।
মুন্সিগঞ্জের মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় হাসপাতালে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসা পেতে, পাসপোর্ট করতে দালালের শরণাপন্ন না হতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে অযথা হয়রানির শিকার না হতে, রাজনৈতিক পরিচয় নয়—যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ নিশ্চিত হোক, একজন নিরপরাধ মানুষ যেন আইনের অপব্যবহারের শিকার না হন, আর সাংবাদিকরা যেন ভয়ভীতি ছাড়াই সত্য তুলে ধরতে পারেন।
জুলাইয়ের শহীদরা যে স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, তা কোনো একটি দলের নয়; পুরো জাতির। সেই স্বপ্নের নাম ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, সুশাসন এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবন।
দুই বছর পর দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—মুন্সিগঞ্জ কি বদলেছে?
হয়তো কিছুটা।
কিন্তু যে পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই পরিবর্তনের পথ এখনো অনেকটাই বাকি।
পরের জুলাইতে যেন আমাদের আর লিখতে না হয়—”সব আগের মতোই আছে।” বরং লিখতে পারি—”মুন্সিগঞ্জ বদলাতে শুরু করেছে।” সেটিই হবে জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।
লেখক: হাসনাত সায়ের, সৌদি আরব প্রবাসী
সম্পাদকের মন্তব্য: ‘পাঠকের মুখোমুখি’ বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব মতামত, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ। এতে প্রকাশিত বক্তব্য, তথ্যের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নের দায় সম্পূর্ণ লেখকের। এসব মতামত আমার বিক্রমপুর-এর সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচ্য নয়। এই বিভাগে যে কেউ যে কোন বিষয়ে লিখতে পারেন। লেখা পাঠান- bikrampuramar@gmail.com -এ









