জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ
মুন্সিগঞ্জ, ২৪ মে ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা, পুস্তক প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে কবির জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রিশাল-এ। কবির স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নজরুলসংগীত পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীতে বাংলা একাডেমি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে “দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি” শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের সমাপনী দিন পালিত হচ্ছে। এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউট-এর উদ্যোগেও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শনিবার ত্রিশালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক। তিনি কবির জীবন ও কর্মকে বিশ্বপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণা ও কবির জীবনদর্শন বিষয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুই গুণী ব্যক্তির হাতে নজরুল পদক ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী নজরুল স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
সম্প্রতি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের জীবনের পরতে পরতে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। জড়িয়েছিলেন নানা পেশায়। ১৯১৭ সালে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও।
১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূচনা করে। একই সঙ্গে তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাম্য, মানবতা, প্রেম, প্রতিবাদ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের প্রধান উপজীব্য।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সপরিবারে আনা হয় কবিকে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-এর পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী”। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: “হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে”। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান- এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।
বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে কামাল পাশা- এতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।
১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরপর এর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: “প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা” ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
তার শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা খুকী ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তখন কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আজও কোটি মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।





