কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক মুন্সিগঞ্জের সন্তান চাষী নজরুল ইসলামের জন্মদিন আজ
২৪

মুন্সিগঞ্জ, ২২ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেলুলয়েডের ফিতায় যিনি প্রথম বন্দি করেছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা। তিনি আর কেউ নন, বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী পরিচালক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা চাষী নজরুল ইসলাম।

আজ ২৩ অক্টোবর, মুন্সিগঞ্জের (প্রাচীন বিক্রমপুর) এই কৃতি সন্তানের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের এই দিনে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব থেকেই সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ১৯৬১ সালে পরিচালক ফতেহ লোহানীর সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রে চাষী নজরুল ইসলামের পথচলা শুরু হয়। এরপর কাজ করেছেন প্রখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা খাঁন আতাউর রহমানের সাথেও। তবে তিনি শুধু পর্দার পেছনের মানুষ ছিলেন না, ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকে এদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন এই বীর সন্তান।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তিনি নির্মাণ করেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়েছিলেন, যা বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক বিরল ঘটনা। ছবিটির মাধ্যমে তিনি সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষের আবেগ, ত্যাগ এবং বিজয়ের আনন্দকে রূপালী পর্দায় জীবন্ত করে তোলেন।

‘ওরা ১১ জন’ দিয়ে যে মহাকাব্যের শুরু, তা তিনি ধরে রেখেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। চাষী নজরুল ইসলাম শুধু মুক্তিযুদ্ধের ছবিই বানাননি, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবদাস’ তিনি দুইবার পর্দায় রূপদান করেছেন—একবার ১৯৮২ সালে বুলবুল আহমেদকে নিয়ে এবং অন্যবার ২০১৩ সালে শাকিব খানকে নিয়ে। এছাড়া তাঁর পরিচালিত ‘সংগ্রাম’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘শুভদা’ এবং ‘চন্দ্রনাথ’ চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে।

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চাষী নজরুল ইসলাম জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি এই কিংবদন্তি পরিচালক ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর জন্মভূমি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের সমষপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও সেলুলয়েডের অমর গল্পগুলোর মাধ্যমে তিনি কোটি বাঙালির হৃদয়ে এবং মুন্সিগঞ্জের মানুষের গর্ব হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ