একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে গত মাসের চেয়ে বিল বেশি: বিদ্যুৎ নিয়ে অতিষ্ঠ মুন্সিগঞ্জবাসী
মুন্সিগঞ্জ, ২ আগস্ট ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
তীব্র গরমের মধ্যে টানা লোডশেডিংয়ে নাকাল হয়ে পড়েছেন মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দারা। দিনের পর দিন ঘনঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, বিদ্যুৎ কম পেলেও গত মাসের তুলনায় এ মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি এসেছে। ফলে একদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীনতা, অন্যদিকে বাড়তি বিল—দুই সংকটে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে জেলাজুড়ে।
শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার (২ আগস্ট) দিনভর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বারবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও আধাঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
রোববার সকাল ১০টার দিকে আমার বিক্রমপুর-এর ফেসবুক পেজে ‘প্রিয় মুন্সিগঞ্জবাসী, ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন কতক্ষণ? এলাকার নামসহ কমেন্টস করুন’ শিরোনামে একটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। পোস্টটি প্রকাশের প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৬৮০টি মন্তব্য আসে। সেখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের বাসিন্দারা নিজেদের এলাকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন।
মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার পাঁচঘড়িয়াকান্দি এলাকার বাসিন্দা আরাফাত রহমান জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে গড়ে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। কাটাখালি এলাকার বাসিন্দা নুসরাত ফারজু বলেন, ঘণ্টা না পেরোতেই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে শিশুদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার ইদ্রাকপুর, দেওভোগ, হাটলক্ষীগঞ্জ, আধারা ইউনিয়নের জাজিরা, পঞ্চসারের নয়াগাঁও ও দশকানিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও একই ধরনের অভিযোগ এসেছে।
টংগিবাড়ীর পাঁচগাঁও ইউনিয়নের খলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রাফসান সিফাত বলেন, দিনে-রাতে মিলিয়ে এতবার বিদ্যুৎ যায় যে স্বাভাবিক জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রীনগরের রাঢ়িখাল ইউনিয়নের মণিমণ্ডল গ্রামের বাসিন্দা মো. সিফাতের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের শিয়ালদি গ্রামের বাসিন্দা মিম ইসলাম জানান, তাদের এলাকায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। লৌহজং উপজেলার মৌছা এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ বলেন, সারাদিনে গড়ে আট ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ মিলছে।
এদিকে শুধু লোডশেডিং নয়, বিদ্যুৎ বিল নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে অসংখ্য গ্রাহক অভিযোগ করেন, বিদ্যুতের ব্যবহার কম হলেও গত মাসের তুলনায় এ মাসে বিল বেড়েছে।
মুন্সিগঞ্জ শহরের এক গ্রাহক মন্তব্যে লেখেন, বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাই না, অথচ বিল আগের মাসের চেয়ে বেশি এসেছে। এটা কীভাবে সম্ভব? আরেকজন লিখেছেন, সারাদিন লোডশেডিং, রাতে ঘুমানোর উপায় নেই। তারপরও বিল বেড়ে গেছে। গতমাসের তুলনায় এক হাজার টাকা বেশি বিল এসেছে।
নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কাজের গতি কমে গেছে। রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শেখ মানোয়ার মোরশেদ বলেন, সমস্যাটি শুধু মুন্সিগঞ্জে নয়, সারাদেশেই রয়েছে। প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় পুরো জেলায় গড়ে ১৫ থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় চাহিদা বেড়ে গেলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে জেলার পরিস্থিতিও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া এবং একই সঙ্গে বাড়তি বিলের অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
তাদের ভাষ্য, শুধু লোডশেডিং কমালেই হবে না, বিদ্যুৎ বিলের অসঙ্গতিগুলোও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।









