ঋণের জন্য পালিয়ে থাকতে হতো, সবজি চাষে স্বচ্ছল মুন্সিগঞ্জের বাছের
145

মুন্সিগঞ্জ, ১৯ জুলাই, ২০২০, জাহাঙ্গীর আলম চমক (আমার বিক্রমপুর)

জীবন মানে যুদ্ধ। এ যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়, কেউবা আবার ধৈর্য্য হারিয়ে খুব সহজেই হেরে যায়। অনেকে আবার এ জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যায় যে পর্যন্ত জয়ী না হতে পারে। জীবন নামের যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে ধৈর্য্য ও মনোবল ধরে রাখা সবচেয়ে জরুরী।

জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া তেমনি এক সৈনিকের নাম বাছের মোল্লা (৫৫)। তার বাড়ী মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কোলা ইউনিয়নের রক্ষিতপাড়া গ্রামে। খুবই সাধারণ ঘরের ছেলে তিনি। এমনকি তার সাংসারিক জীবনও খুবি সাধারণ। চার ছেলের জনক তিনি। অভাব অনটন আর টানা পোরার মধ্য দিয়ে চলছিলো তার সংসার জীবন। এক কথায় দিন মজুরের কাজ করেই চলতো তার জীবন। নুন আনতে পানতা ফুরোই যখন, এমন দিনগুলো আর কাটছিলোনা।

তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠাবেন। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ তুললেন। এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে ছেলেকে বিদেশে পাঠাবার জন্য টাকা ধার নিয়ে কোন একজন দালালের কাছে ছেলেকে ইতালি পাঠানোর জন্য টাকাগুলো জমা দিলেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ছেলেকে আর বিদেশ পাঠানো হলো না। দালাল টাকাগুলো আত্মসাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় তার সাথে।

একেতো এমনিতেই মরা। তার উপর আবার লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা। আসমান ভেঙে পরেছে যেন তার মাথার উপর। ওদিকে এনজিওর লোকজন কিস্তি আদায়ের জন্য ঘুর ঘুর করছে প্রতিদিন। সারাজীবনের জমানো টাকা আর ঋণ করা টাকার একটি টাকাও যে তার হাতে নেই। রিতিমত আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখছিলেন না তিনি। তবুও ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে যুদ্ধে যে জয়ী হতেই হবে তাকে।

মনোবল শক্ত করে পিতা আর পুত্ররা মিলে শুরু করলেন জীবন যুদ্ধ। অন্যের থেকে বরগা (বাৎসরিক ভাড়ায়) ১৪ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন সবজি আবাদ করতে শুরু করলেন। সেগুলো স্থানীয় লোকজনের কাছে বিক্রি করে কিছু কিছু ঋণ শোধ করতে শুরু করলেন। জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়াটাই যেন ছিলো তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

সবজি বিক্রির টাকা থেকে টাকা জমিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ালেন সবজি চাষের জমি। টানা তিন বছর জীবন যুদ্ধের অংশ হিসেবে স্বপরিবারে রাত দিন চেষ্টার পর অবশেষে বর্তমানে ৯৮ শতাংশ জমিতে চাষ করছেন প্রায় ৮-১০ রকমের সবজি।

সেগুলো উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজার বিক্রি করে পরিশোধ করেছেন ঋণের টাকা। একটি ভ্যানও কিনেছেন তিনি। যেটি দিয়ে পার্শ্ববর্তী শ্রীনগর উপজেলাতে ক্ষেতের সবজি নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছেন তার ছেলেরা।

বর্তমানে ঋণ শোধ করে লাভের মুখ দেখছেন তারা। তাদের সংসারে এখন স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

রাত-দিন পরিশ্রম, ধৈর্য্য ও মনোবলকে কাজে লাগিয়ে আজ তারা জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে সাফল্যের মুখ দেখতে পেয়েছেন।

বাছের মোল্লা জানান, ঋণের জন্য যখন পালিয়ে থাকতে হতো, তখন চিন্তা করলাম জমিতে কিছু সবজি চাষ করি। বিক্রি না হলেও নিজেরা খেয়ে বাঁচতে তো পারবো। বাজারে সবজির চাহিদা দেখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাঁচার নতুর স্বপ্ন দেখি। দিনরাত জমিতেই পরে থাকতাম, ফসলের যত্ন নিতাম। আর ভাবতাম আল্লাহ এই ফসলের উছিলায় আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। আল্লাহর রহমতে খেয়ে পড়ে ভালোই ছিলাম। লকডাউনের করণে পরিবার নিয়ে চিন্তায় পড়ি আবার, ঠিক মত বের না হতে পারলে চলবো কি করে? আমাদের এই বিপদে যদি সরকারের সহযোগিতা পেতাম পরিবার নিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারতাম। সর্বোপরি ধৈর্য্য, পরিশ্রম আর মনোবল ঠিক থাকলে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ