২০ বছর পর মুন্সিগঞ্জের নুর বয়াতির চরে শিক্ষার আলো: ২৩৬ শিশু পেল বই, জাগলো ভবিষ্যৎ
মুন্সিগঞ্জ, ২ জানুয়ারি ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
পদ্মার পাড়ে সকালটা আসে কুয়াশা ভেঙে। নদীর ওপর তখনো হালকা ধোঁয়ার মতো আবরণ, আর সেই আবরণের ভেতর দিয়ে নুর বয়াতির চরটাকে মনে হয় ভাসমান কোনো ভূখণ্ড-স্থির নয়, নিশ্চিত নয়।
এই চরে মানুষের ঘর যেমন অস্থায়ী, তেমনি অস্থায়ী ছিল শিশুদের শৈশবও। স্কুলহীন, বইহীন, ঠিকানাহীন।
এত দিন শিশুদের সকাল শুরু হতো অন্যভাবে। কেউ বেরিয়ে পড়ত জাল হাতে, কেউ বালুচরের দিকে ছাগল তাড়াতে তাড়াতে। খালি পায়ে দৌড়, রোদে পোড়া মুখ, চোখে কোনো প্রশ্ন না থাকা একধরনের মেনে নেওয়া-এই ছিল নুর বয়াতির চরের শিশুজীবন।
নতুন বছরের প্রথম সকালে সেই চিত্রটা একটু ভিন্ন। গতকাল বৃহস্পতিবার চরজুড়ে অচেনা এক নড়াচড়া।
নদীর ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশে যায় কাগজের পাতার খসখস। শিশুরা হাতে ধরে আছে বই। রঙিন মলাটে আঁকা ছবি দেখে কেউ থমকে যায়, কেউ আবার নাম লেখার চেষ্টা করে প্রথম পাতায়। নিজের না-এই প্রথম।
দশ বছরের তানজিলা বইয়ের পাতায় আঙুল রেখে শব্দ ভাঙে। উচ্চারণ ঠিক হয় না, তবু সে থামে না। তার কাছে শব্দের চেয়ে বড় ব্যাপার হলো-এই বইটা তার নিজের।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, “আমরা তো পড়তে পারিনি। মেয়েটা যেন পারে-এই চাওয়াই ছিল।”
নুর বয়াতির চর এমন এক জায়গা, যেখানে গত বিশ বছরে পদ্মা নদী শুধু মাটি ভাঙেনি, ভেঙেছে মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও। নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রায় তিন শ পরিবার এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। কেউ ভেবেছিল, সাময়িক আশ্রয়। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, চরই হয়ে গেছে স্থায়ী। শুধু স্কুল আর হয়নি। এই চরের শিশুদের স্কুল মানে ছিল দূরের গল্প। মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে নৌকা, বর্ষায় ঝুঁকি, শীতে দীর্ঘ হাঁটা। সেই পথে প্রতিদিন যাতায়াত করার সামর্থ্য ছিল না কারও। ফলে শিশুদের জীবন আটকে গেছে চরের সীমার ভেতরেই।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশ পায় এই চরের গল্প।
স্কুলহীন শিশুদের ছবি দেখে চুপ থাকতে পারেননি স্থানীয় শিক্ষা উদ্যোক্তা সুজন মৃধা। তাঁর মনে হয়েছিল, এই শিশুদের চোখে তাকিয়ে থাকা যায় না। “আমরা যদি শুরু না করি, কেউ করবে না”- এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় নতুন উদ্যোগের।
তার পাশে দাঁড়ান সাইফুল মৃধাসহ আরও কয়েকজন। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন- স্কুল না থাকলে খোলা আকাশই হবে শ্রেণিকক্ষ। নাম দেন ‘বর্ণমালা পাঠশালা’।
কয়েক দিনের মধ্যেই খোলা মাঠে হোগলা আর পাটি বিছিয়ে বসে পড়ে শিশুরা। কোনো বেঞ্চ নেই, নেই দেয়াল, নেই ব্ল্যাকবোর্ড। আছে শুধু মাটির গন্ধ, নদীর বাতাস আর শেখার আগ্রহ। বই হাতে শিশুরা গোল হয়ে বসে। কেউ শব্দ ধরে, কেউ আঁকিবুঁকি কাটে।
সাইফুল মৃধা বলেন, “স্কুল ভবন না থাকলেও শিক্ষা থামতে পারে না। অন্তত বর্ণমালাটা শিখুক-এই ছিল আমাদের ভাবনা।” ‘বর্ণমালা পাঠশালা’ চালাতে তারা খুঁজে বের করেছেন চরের ভেতর ও আশপাশের শিক্ষিত নারী-পুরুষদের। কেউ এসএসসি পাস, কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ আগে শিক্ষকতা করতেন। তারাই এখন স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের পড়াচ্ছেন। সকালে বা বিকেলে, কাজের ফাঁকে, তারা বসেন শিশুদের পাশে।
একজন স্থানীয় নারী শিক্ষক বলেন, “আমি নিজেও এই চরে বড় হয়েছি। আজ এই শিশুদের পড়াতে পারছি-এটাই আমার আনন্দ।” নতুন বই বিতরণের পর প্রশাসনের সহায়তাও যুক্ত হয়েছে এই উদ্যোগে।
জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের দ্রুত পদক্ষেপে কৃতজ্ঞ স্থানীয়রা।
তারা বলছেন, প্রশাসনের সহযোগিতা না পেলে হয়তো এই উদ্যোগ এত দ্রুত সম্ভব হতো না।
অনেক অভিভাবক প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে সবাই জানে-এটি শুরু মাত্র। হোগলার পাটিতে বসা এই পাঠশালা স্থায়ী সমাধান নয়। নদীর বৃষ্টি, রোদ, ঝড়-সবই এর শত্রু। তবু এই খোলা মাঠেই এখন স্বপ্ন বোনা হচ্ছে।
সুজন মৃধা বলেন, “আজ খোলা মাঠে বসে পড়ছে, কাল যদি একটা স্কুল হয়-এই আশাটাই আমাদের ধরে রেখেছে।” পদ্মার ঢেউ তখনো ভাঙে। চর তখনো নড়বড়ে।
কিন্তু সেই ঢেউয়ের শব্দের ভেতর এখন অন্য এক শব্দ মিশে গেছে-শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত বর্ণমালা। ক–খ–গ…
নুর বয়াতির চরে এখন আর শুধু নদীর গল্প নয়- শুরু হয়েছে শিক্ষার গল্প।


