সেতু-বাঁধ- সড়কের অপেক্ষায় লক্ষাধিক মানুষ, উন্নয়ন কবে মিলবে দিঘীরপাড়ের চরাঞ্চলে?
5

মুন্সিগঞ্জ, ৭ জুলাই ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চল এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়ন যেন এখনো অধরা স্বপ্ন। বছরের পর বছর ধরে একটি সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং পাকা সড়কের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী।

তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই জনপদ যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। ফলে নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আজও রয়ে গেছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দিঘীরপাড়ের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত রয়েছে মুন্সিগঞ্জের চরবাংলাবাজার, শরীয়তপুর জেলার শিলই, নওপাড়া, চরআত্রা, কাঁচিকাটা, কুন্ডেরচর, কোরবি ও মনিরাবাজসহ একাধিক এলাকা। এছাড়া চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলার কয়েকটি চরাঞ্চলের মানুষেরও যাতায়াতের অন্যতম পথ এটি। সব মিলিয়ে প্রায় ১০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু এখনো সেখানে নেই একটি স্থায়ী সেতু। বর্ষা মৌসুমে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো জনপদ। জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন কিংবা দৈনন্দিন কাজ—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু একটি সেতু নির্মাণই নয়, নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধও সময়ের দাবি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীর ভাঙনে অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারকে একাধিকবার বসতভিটা স্থানান্তর করতে হয়েছে। স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

স্থানীয়দের মতে, সেতু, বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মাণ হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে না; কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। চরাঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।

গত ৭ জুন ২০২৬ কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং নদীভাঙনের বাস্তব চিত্র সরেজমিনে দেখেন। এ সময় স্থানীয়রা সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মাণের দাবি তুলে ধরেন।

এর ধারাবাহিকতায় ১১ জুন উন্নয়নের বৈষম্যের অবসান এবং চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, যুব সমাজ ও আলেম সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চরাঞ্চলের মানুষ উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক অভিভাবক বলেন, সেতু ও ভালো রাস্তা না থাকায় আমাদের সন্তানদের উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করতে পারে না। কেউ কেউ মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় কৃষক আব্বাস খালাসী বলেন, আমাদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে নদী পার হতে হয়। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়, সময়ও নষ্ট হয়। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। একটি সেতু ও পাকা রাস্তা হলে কৃষকরা অনেক উপকৃত হবেন।

যুব সমাজের প্রতিনিধি আক্তার গাজী বলেন, প্রতিবছর নদীভাঙনে অসংখ্য মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছে। আমরা শুধু আশ্বাস শুনতে চাই না। দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ, সেতু ও রাস্তার কাজ শুরু হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

২১ জুন চরাঞ্চলের যুব সমাজ ও আলেম সমাজের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়। সেখানে সেতু নির্মাণ, স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং পাকা সড়ক নির্মাণের দাবি জানানো হয়। জেলা প্রশাসক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।

পরবর্তীতে ৪ জুলাই মুন্সিগঞ্জ-২ (টংগিবাড়ী-লৌহজং) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল সালাম আজাদ এমপি কান্দারবাড়ি নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় এলাকাবাসী তাঁর হাতে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর তুলে দেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

একইভাবে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ আলো এমপিও নদীভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন।

স্থানীয়দের দাবি, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় এই অঞ্চলের শিক্ষার হার আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয় ও কলেজে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক সময় তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতেই পারে না। জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও সহজ যোগাযোগ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে রয়েছে।

এলাকাবাসীর বিশ্বাস, দিঘীরপাড়ে একটি সেতু, চরাঞ্চল রক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পাকাকরণ করা হলে শুধু একটি ইউনিয়নের নয়, পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে যাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

দীর্ঘদিনের আন্দোলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি এবং জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের পর এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—আর প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন হোক দিঘীরপাড়ের সেতু, স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। কারণ, তাদের মতে, এই তিনটি অবকাঠামোই বদলে দিতে পারে লক্ষাধিক চরবাসীর বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।প্রতিবেদনটি সংবাদপত্রের ফিচারধর্মী স্টাইলে আরও সমৃদ্ধ করতে চাইলে বিভিন্ন উপশিরোনাম, তথ্য-উপাত্ত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্যও যুক্ত করা যেতে পারে।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ