৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বৃহস্পতিবার | রাত ৮:৫৪
মুন্সিগঞ্জের সোহেল রানা: জুলাই আন্দোলনে গিয়ে নিখোঁজ, দেড় বছর পর কবরের সন্ধান পেলেন মা
খবরটি শেয়ার করুন:
247

মুন্সিগঞ্জ, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, মানসুরা হোসাইন, প্রথম আলো

সন্তান হারানো শোকের কি কোনো শেষ আছে! দিন পেরিয়ে বছর গড়ায়—তবু বাবা-মায়ের হাহাকার থামে না। যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী সোহেল রানা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা রাশেদা বেগমের জীবনও যেন থমকে ছিল একটি প্রশ্নে—কোথায় আমার ছেলে?

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনে গিয়ে আর বাড়িতে ফেরেননি ৩৮ বছর বয়সী সোহেল রানা। পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মরদেহ চিনতে পারলেও কোথায় দাফন করা হয়েছে, তা জানত না পরিবার।

৩৪ দিন পর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহগুলোর নথিতে সোহেলের ছবি খুঁজে পান তাঁরা। তখন থেকেই রাশেদা বেগম ছেলের লেমিনেটিং করা ছবি হাতে নিয়ে ‍কবরস্থানে গিয়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করতেন। ১১৪টি বেওয়ারিশ কবরের ভিড়ে খুঁজতেন, কোনটি তাঁর ছেলের?

অবশেষে ৫ জানুয়ারি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন রাশেদা বেগম। ছেলের ছবি নিয়ে কবরস্থানের যে জায়গায় তিনি প্রায় সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন, সেটি ২৯ নম্বর কবর। কবর থেকে ১১৪টি লাশ তুলে ডিএনএ পরীক্ষা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, ২৯ নম্বর কবরেই সোহেলকে দাফন করা হয়েছে।

সোহেলের কবর খুঁড়ে শুধু হাড় পাওয়া গেছে। তাই রাশেদা বেগমের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ, যদি আরও আগে লাশগুলো তোলা হতো, তাহলে হয়তো ছেলের মুখটা অন্তত শেষবার দেখতে পেতেন।

মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোড়দৌড় এলাকার লাল মিয়ার পুত্র কাপড় ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা (৩৭)। থাকতেন- ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায়। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন সবার বড়। তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ওই জুলাইয়ে উত্তাল ছিল বাংলাদেশ। ক্ষমতাসীনদের দমন–পীড়নে রক্তাক্ত দেশ এক অভ্যুত্থানের পথে যায়। সেই তোড়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি তখন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয়।

শুধু সোহেল রানার পরিবার নয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত এবং এত দিন বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া শহীদদের আটটি পরিবার তাদের স্বজনের কবর খুঁজে পেয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৮০ জন, আগস্টে আরও ৩৪ জনসহ মোট ১১৪টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছিল।

পুলিশি আবেদনে আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে দাফন হওয়া এসব মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ আসে আদালত থেকে। গত বছরের ৪ আগস্ট আদেশ হওয়ার পর ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ তুলে অস্থায়ী মর্গে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ময়নাতদন্ত করা হয়। পরিচয় শনাক্ত করতে অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের নয়টি পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে সিআইডি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ কাজে আন্তর্জাতিক ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞ লুয়িস ফনডিব্রাইডারসহ দেশি-বিদেশি ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করেন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৮০ জন এবং আগস্টে আরও ৩৪ জনসহ মোট ১১৪টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছিল।

স্বজনদের সঙ্গে ডিএনএ মেলার পর পরিচয় শনাক্ত হওয়া অন্য শহীদেরা হলেন মো. মাহিন মিয়া, আসাদুল্লাহ, পারভেজ ব্যাপারী, রফিকুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, ফয়সাল সরকার ও কাবিল হোসেন। অন্য একটি মৃতদেহের শনাক্তকরণপ্রক্রিয়া চলছে।

ফেইসবুকে আমরা
ইউটিউবে আমরা