২০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গলবার | সকাল ৮:২২
বিজয়ের মাসে গজারিয়ার রক্তাক্ত স্মৃতি: ৯ মে ১৯৭১- যেদিন মেঘনা লাল হয়েছিল
খবরটি শেয়ার করুন:
205

মুন্সিগঞ্জ, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

বিজয়ের মাস এলেই গজারিয়ার মানুষের চোখে ভেসে ওঠে সেই কালো দিন- ৯ মে ১৯৭১, রোববার ভোর। আগের দিন ঈদে মিলাদুন্নবীর মিলাদ তবারক বিতরণ করে নামাজ পড়ে মানুষ গভীর ঘুমে। হঠাৎ গুলির শব্দ আর নারী-পুরুষ-শিশুর আর্তচিৎকার।

পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে বেলুচ রেজিমেন্টের ১০০ জন আর্মি নিয়ে দোতলা লঞ্চ ও দুটি গানবোট গভীর রাতে মেঘনায় ভিড়ে। তার আগে থানা আক্রমণ করে দখল করে নেয়।
তারপর শুরু হয় নির্মমতম গণহত্যা।

গোসাইরচর, নয়নগর, বালুরচর, বাঁশগাঁও জেলেপাড়া, ফুলদী, নাগের চর, কলসেরকান্দি, দড়িকান্দি ও গজারিয়া- এই দশ গ্রামে ঘরে ঘরে খুঁজে যুবকদের বের করে ব্রাশফায়ার। সকাল ছয়টার মধ্যে সোনালি মার্কেট এলাকায় রাস্তার ওপর সারিবদ্ধ করে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধাসহ ১১০ জনকে একসঙ্গে গুলি। যারা গুলিতে মরেনি, তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মসজিদে কোরআন পড়তে থাকা মানুষও রেহাই পায়নি। শিশুরাও রেহাই পায়নি। নারীদের ঘর থেকে ধরে এনে গোসাইচর জামে মসজিদের পাশে বীজিগারে অত্যাচার করা হয়। নারীদের চীৎকার ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের আনাচে-কানাচে।

সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয় মোট ৩৬০ জনকে। এমন কোনো বাড়ি ছিল না, যেখানে কাউকে হত্যা করা হয়নি। ধর্ষণ, লুটতরাজ ও আগুন – সব মিলিয়ে এক ভয়াল দিন ছিল ৯ মে ১৯৭১।

১২ মে ঢাকার ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশন থেকে ইসলামাবাদে পাঠানো গোপন টেলিগ্রামে বলা হয়, গজারিয়ায় ৫০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

‘গণহত্যা গজারিয়া: রক্ত মৃত্যু মুক্তি’ বইয়ের লেখক গবেষক শাহদাত পারভেজ জানিয়েছেন, মাত্র ১৩০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। বাকিদের লাশ ফুলদী ও মেঘনার বুকে ভেসে গেছে। শকুন আর কাক খেয়েছে। তাদের পরিচয় আর পাওয়া যায়নি।

গণকবরের স্মৃতিফলকে বাবার নাম দেখে শহীদ পুত্র জাহেদের চোখে আজও জল আসে। সেই একদিনে বাবা, দাদা, চাচাসহ পরিবারের সাতজনকে হারিয়েছিলেন। কিশোর জাহেদই ছিলেন পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য।

গোসাইচর চার নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবীন শিক্ষক আসাদুজ্জামানের চাচা পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, ফুফা নদী পেরোতে গিয়ে মারা পড়েন। পরিবারের তিনজনকে হারান।

ইসমানির চরের দুই নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা তানেসউদ্দীন সেই রাতেই মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারতে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ভবেরচর ব্রিজ উড়িয়ে দেন, বাঞ্ছারামপুর, ঘাগুটিয়াসহ গ্রাম শত্রুমুক্ত করেন।

আজ বিজয়ের মাসে গজারিয়ার মানুষ শহীদদের স্মরণ করে বলে- এই রক্তের বিনিময়েই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা, এসেছে বিজয়।