২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গলবার | বিকাল ৪:৪১
বিক্রমপুরে ক্রীতদাস প্রথার ইতিহাস
খবরটি শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জ ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯, বিশেষ প্রতিনিধি (আমার বিক্রমপুর)

ক্রীতদাস প্রথার ইতিহাস অতি প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ থেকে ৩০০০ সালে মেসোপটেমিয়ায় প্রথম ক্রীতদাস প্রথার চালু হয় । তারও হাজার খানেক বছর পর থেকে এই প্রথা ছড়িয়ে পড়ে মিশর আর ভারতে।

ইতিহাসে বিক্রমপুরে দাস বিক্রয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৩২০ সনের ভাদ্রমাসের “সাহিত্য” পত্রিকায় ক্রীতদাস ক্রয়- বিক্রয়ের একটি দলীল প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় ২০০ বৎসর পূর্বেও বিক্রমপুরে অভাবের তাড়নায় পড়ে মানুষ দাসরূপে বিক্রয় হতো এবং ঋণ গ্রহণ করেও অনেকে দাসত্ব স্বীকার করতো।

ইউরোপ ও আমেরিকায় যেভাবে দাস ব্যবসা প্রচলিত ছিল, আমাদের বিক্রমপুরেও সেইভাবে দাসগণ ক্রয় ও বিক্রয় হতো।

বাংলায় মানুষ বিক্রি বা দাস বেচাকেনার অনেক উল্লেখ বিদেশি পর্যটকদের বিবরণে রয়েছে।

মরক্কোর পর্যটক শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৭ খ্রি.) প্রায় দুই মাস বাংলায় সফর করার সময় মানুষ বেচাকেনার ঘটনা নিজ চোখে দেখেছেন, যা তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে লিপিবদ্ধ করেছেন।

মসলিন কাপড়, মিহি সুতি বস্ত্র, মসলা প্রভৃতি কেনাবেচার হাটে দাস-দাসী বিক্রি করা হতো বলে বিভিন্ন পর্যটক তাঁদের বিবরণীতে তুলে ধরেছেন।

মানুষ কিংবা দাস-দাসী বিক্রির চুক্তিপত্রের অধিকাংশই রেজিস্ট্রি করা হতো।

বিক্রমপুর, শ্রীহট্ট (সিলেট), চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কালাইয়া বন্দর (বরিশাল), মহেশ্বরদী (নরসিংদী) ও ধামরাই এলাকায় মানুষ বিক্রি ও দাস বেচাকেনার ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শিশু ও বৃদ্ধদের বাজারদর ছিল পাঁচ থেকে সাত টাকা।

স্বাস্থ্যবান নারী-পুরুষের মূল্য ছিল ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। কলকাতা জাদুঘরে রক্ষিত একটি প্রাচীন দলিল থেকে জানা যায়, ১৮০৩ সালে ঢাকার নিকটবর্তী ধামরাই গ্রামের বদন চান্দ নামে এক ব্যক্তি মহাজনের ঋণ শোধ করতে না পেরে তাঁর স্ত্রী সরস্বতী এবং তিন বছরের শিশুপুত্র ডেঙ্গুচন্দকে আত্মবিক্রয় করে দেন কৃষ্ণরাম মৌলিকের কাছে।

সংবাদটি ‘সমাচার দর্পণ’-এর ১৮২৫ সালের ১৮ জুন সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।

মানসী পত্রিকার ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যা থেকে জানা যায়, প্রাচীন বাংলা ভাষায় লিখিত একটি দলিল বিক্রমপুরের মালপদিয়া গ্রাম থেকে পাওয়া যায়। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি হিসেবে দরিদ্র এক কৃষকের কাছে সেটি ছিল। ওই দলিলে অভাবের তাড়নায় আত্মবিক্রি বা নিজেকে বিক্রির বিবরণ রয়েছে। দলিলে গোকুল ঢুলি বকলম দাতা হিসেবে টিপসই দিয়েছেন। দলিলগ্রহীতা ছিলেন কালীকৃষ্ণ দেবশর্মা।

দলিল সূত্রে জানা যায়, আর্থিক দৈন্যের কারণে ভরণপোষণের বিনিময়ে গোকুল ঢুলি মাত্র ২০ টাকায় নিজেকে বিক্রি করেন। দলিল সম্পাদনের তারিখ ২ বৈশাখ ১১২১ বঙ্গাব্দ। দলিল লেখকের নাম শ্রীরামচন্দ্র বৈতজ্ঞ। এ কাহিনী রেকর্ডরুমের দলিলে রয়েছে। একসময় বিক্রমপুর দাস বিক্রি এবং নারী বেচাকেনার হাটে পরিণত হয়েছিল। মুদি ও মনিহারি পণ্যের মতো সুন্দরী রমণী নৌকায় করে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ক্রয়- বিক্রয় করা হতো।

error: দুঃখিত!