তার নাম রেখেছিলেন শেরেবাংলা, মুন্সিগঞ্জের গর্ব কালজয়ী চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম
৯৯

মুন্সিগঞ্জ, ২ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। চারদিকে তখনো বারুদের গন্ধ, স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর একই সঙ্গে নতুন সূর্যোদয়ের উল্লাস। ঠিক সেই সময় অস্ত্র জমা দিয়ে একদল তরুণ বুকে ধারণ করলেন ক্যামেরা। লক্ষ্য ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে রূপালি পর্দায় ধরে রাখা। সেই রূপালি পর্দার প্রধান সেনাপতি ছিলেন চাষী নজরুল ইসলাম। যাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ [সবাক চলচ্চিত্রের জনক আব্দুল জব্বার খানের উত্তরসূরি হিসেবে]।

মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর গ্রামে ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী চলচ্চিত্রকার। মা শায়েস্তা খানম এবং বাবা মোসলেহ উদ্দিন খানের বড় সন্তান এই তিনু (তাঁর ডাকনাম) যে একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেবেন, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি। অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মানুষটির নামের আগে ‘চাষী’ উপাধিটি যুক্ত করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।

চাষী নজরুল ইসলামের মামা চাষী ইমাম উদ্দিন ছিলেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। তিনি শেরেবাংলার সাথে রাজনীতি করার পাশাপাশি তাঁর পরিচালিত বিখ্যাত ‘নবযুগ’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার সাথেও যুক্ত ছিলেন। মামার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সুবাদে শেরেবাংলার সাথে তাঁদের পারিবারিক অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল।

পরিবারের পক্ষ থেকে একদিন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হককে শিশুটির জন্য একটি সুন্দর নাম দিতে অনুরোধ করা হয়। তখন শেরেবাংলা দুটি বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই অভিনব নামটি তৈরি করেন।

স্বাধীনতার ঠিক পর পরই, ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় কালজয়ী সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’। সিনেমাটি শুধু একটি গল্প ছিল না; এটি ছিল বাস্তব আর কল্পনার এক অপূর্ব মিশেল। নিজে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় চাষী নজরুল ইসলাম চলচ্চিত্রে বাস্তবতার সর্বোচ্চ ছোঁয়া রেখেছিলেন। সিনেমার মূল চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছিলেন খসরু এবং খসরুর নেতৃত্বাধীন সত্যিকারের একদল বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বাঙালি জাতির রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, মানসিক ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি এবং স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে তিনি যেভাবে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজ অর্ধশতক পরেও দর্শকদের রোমাঞ্চিত করে।

‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণের পর চাষী নজরুল ইসলামকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি একে একে উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একের পর এক মাস্টারপিস। ১৯৭৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘সংগ্রাম’, যেখানে সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ উঠে এসেছে। এরপর ১৯৯৭ সালে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। এই চলচ্চিত্রে একজন মায়ের দেশের জন্য নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করার হৃদয়বিদারক দৃশ্য আজও বাঙালিকে কাঁদায়। এছাড়া ‘মেঘের পরে মেঘ’ ও ‘কামলপুরের যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রণাঙ্গনের লড়াইয়ের সফল চিত্রায়ণ করেছেন তিনি।

কোনো জটিলতা ছাড়াই বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ধ্রুপদী সৃষ্টিগুলোকে সেলুলয়েডে প্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবদাস’ তিনি দুইবার দুই প্রজন্মের জন্য নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তাঁর নির্মিত ‘শুভদা’, রবীন্দ্রনাথের গল্প অবলম্বনে ‘শাস্তি’ ও ‘শুভা’ চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে।

চলচ্চিত্রে অনন্য অবদান এবং শিল্পকলায় বিশেষ কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি লাভ করেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’। এছাড়া ‘শুভদা’ এবং ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মাননা লাভ করেন।

২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ৭৩ বছর বয়সী এই মহান কারিগর। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।

হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার পর, তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল তাঁর পরম প্রিয় জন্মভূমি মুন্সিগঞ্জের মাটিতে। শ্রীনগরের সমষপুর গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে বাবা ও মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই জীবন্ত ইতিহাস।

মুন্সিগঞ্জ বহু পণ্ডিত, বিজ্ঞানী ও রাজনেতার জন্ম দিয়েছে ঠিকই, তবে চাষী নজরুল ইসলাম ছিলেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি ক্যামেরার লেন্সকে বাঙালির আত্মত্যাগ ও বীরত্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিগুলোর মধ্য দিয়ে প্রতিটা বাঙালির হৃদয়ে এবং মুন্সিগঞ্জের গৌরবের পাতায় তিনি চিরকাল অমর থাকবেন।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ