১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সোমবার | সন্ধ্যা ৭:৩৭
এক বছরে কি পেল মুন্সিগঞ্জবাসী?
খবরটি শেয়ার করুন:
192

মুন্সিগঞ্জ, ৬ আগস্ট ২০২৫, হাসনাত সায়ের (আমার বিক্রমপুর)

স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পর রাজনৈতিক ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ ও জীবন আত্মদানের ফলস্বরুপ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও কতৃত্ববাদী সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার লজ্জাজনক পলায়নের এক বছর পূর্তি হলো।

ছাত্র-জনতার সেই ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে’ মুন্সিগঞ্জের প্রাণ দিয়েছেন ১৬ জন। এর মধ্যে শহরের সুপারমার্কেটের আলোচিত ঘটনায় শহিদের সংখ্যা ৩। কিন্তু এক বছর পর জুলাই শহিদ পরিবার থেকে শুরু করে জুলাই যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সামনে একটি প্রশ্ন হাজির হয়েছে। সেটি হলো- ‘মুন্সিগঞ্জের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিরসন হলো কতটুকু?’ বা বিগত আমলে মুন্সিগঞ্জের দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট যেমন- মোটরসাইকেল মহড়া, থানায় গিয়ে তদবির করা, সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করা, আদালতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা পরিবর্তন হলো কি? নাহলে কেন হলো না? এর দায় কার কার?

শেখ হাসিনার পলায়নের পরপরই মুন্সিগঞ্জে নতুন করে পরিবর্তনের আশার সঞ্চার হয় সাধারণ খেটেখাওয়া, সুবিধা নিতে অনাগ্রহী ও রাজনীতি বিমুখ মানুষের মাঝে। চায়ের দোকান থেকে পড়ার টেবিল পর্যন্ত মানুষের মধ্যে আলোচনা ছিলো- এবার মনে হয় পরিবর্তন আসবে মুন্সিগঞ্জে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ভোগান্তিগুলো নিরসন হবে। সেবাপ্রাপ্তি সহজ হবে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে। উন্নত হবে শহরের রাস্তাঘাট। এছাড়া জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও পরিবর্তন আসবে সমতার ভিত্তিতে।

কিন্তু গত এক বছরের চিত্র মূল্যায়ন করলে দেখা যাচ্ছে- সবকিছু আগের মতই রয়ে গেছে। সরকার পতনের আগে জেলার সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অবস্থা ছিলো এখনও তেমনি আছে। কাঠামোগত সংস্কার যেমন আসেনি পরিবর্তন হয়নি মনমানসিকতারও।

এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের দুই উপদেষ্টার নানা দৌড়ঝাপও দেখা গেছে। আশ্বাসও মিলেছে তাদের পক্ষ হতে। চেষ্টার কোন কমতি নেই- কিন্তু এক বছরেও দৃশ্যমান হয়নি কিছু। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দুই-তিন মাসের মধ্যে মুন্সিগঞ্জে যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেই সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি মেডিকেল কলেজ। তাহলে কি শুধুই আশার ফুলঝুড়ি?

এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে যে একটি গোষ্ঠিকে সরকারের সমালোচনায় মুখর থাকতে দেখা গেছে তাদের এখন দেখা যাচ্ছে বর্তমান সরকারের সমালোচনা যারা করছেন তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। কারণ হিসাবে বোঝা যাচ্ছে- গোষ্ঠিটি বর্তমান সরকারের সমর্থক।

রাজধানীর পাশের ‘শান্তিপ্রিয়’ জেলা হিসাবে খ্যাত মুন্সিগঞ্জের মানুষের চিন্তা-চলন নিয়ে সারাদেশেই সুনাম রয়েছে। ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ শহরের ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডগুলো রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোন প্রাণ না ঝড়িয়েই মোকাবিলা করা যেত। এ কথা সকলেই বিশ্বাস করেন।

মুন্সিগঞ্জ শহরের বহুল ব্যবহৃত মানিকপুর থেকে সুপারমার্কেট এবং সুপারমার্কেট থেকে উভয়পাশ দিয়ে কাটাখালি পর্যন্ত সড়কটি গত এক বছরেও স্থায়ী সংস্কারের ব্যবস্থা করা যায়নি। মুক্তারপুর সেতুর গোড়ায় যানজট নিরসন করা যায়নি, নির্মিত করা যায়নি যাত্রী ছাউনি। মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন হয়নি। মুক্তারপুর থেকে ছনবাড়ি পর্যন্ত সড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণ কাজ শুরু হয়নি। এক্সপ্রেসওয়ে-হাইওয়েতে শৃঙ্খলা ফেরেনি, কমেনি দুর্ঘটনা। টংগিবাড়ীতে কুন্ডেরবাজার সেতু সংস্কার হয়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মান উন্নয়ন হয়নি। বন্ধ হয়নি হাট-বাজার, বিভিন্ন স্ট্যান্ডের চাঁদাবাজি। অবৈধ বালু মহাল নিয়ে হানাহানি ঠিক আগের মতই দেখা যাচ্ছে। আড়িয়াল বিলসহ ফসলি জমি ভরাট ও মাটিকাটা বন্ধ হয়নি, জারি আছে নৌপথে চাঁদাবাজি। সাইনবোর্ড টানিয়ে অবৈধ আবাসন ব্যবসার বিস্তার আগের মতই, প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে মাদক ব্যবসার বিস্তার আগের তুলনায় আরও বেড়েছে, ইজারাবিহীন হাট-বাজার থেকে চাঁদা আদায় করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্টরা। থমকে গেছে বহুর আকাঙ্খিত মেঘনা সেতু নির্মাণ কাজ। জেলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোও রয়ে গেছে বেহাল অবস্থায়।

কিন্তু এসব জনস্বার্থ বিষয়ে আন্দোলন-প্রতিবাদ করতে কোন পক্ষকে এখন আর দেখা যায় না। তাদের দেখা যায়- প্রশাসনের কাছাকাছি কোন সভা-সেমিনারে। কোর্টের মামলায় কোন আসামির জামিন শুনানির সময় অংশ নিতে। অথবা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যানার নিয়ে দাড়াতে।

আসলে, মুন্সিগঞ্জের মানুষের আশাগুলো ম্লান হতে শুরু করে জুলাইয়ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাগুলোকে বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে মানুষকে অস্থির করে তোলার সময় থেকেই। এছাড়াও আদালতে মব তৈরির হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়া, থানায় ঢুকে সরকার সমর্থকদের তদবির-খবরদারি জারি রাখা, ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয়া, কলেজ ছাত্রাবাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলে নিজেরাই রাজনীতিতে অংশ নেয়া, স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অনলাইন-অফলাইনে মব সৃষ্টি করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে।

মুন্সিগঞ্জে ৪ আগস্টের আন্দোলনে যেখানে লোক ছিলো কয়েক হাজার। এখনকার মিছিল-সমাবেশে সেই লোক ৫০-এ এসে ঠেকেছে। তবু আশা রাখতে চাই, কারও না কারও হাত ধরে পরিবর্তন আসবে মুন্সিগঞ্জে। সুযোগসন্ধানীরা একসময় ব্যাকফুটে চলে যাবে। ‘শান্তিপ্রিয়’ এই জনপদের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হবে। দুর্ভোগগুলো তাদের আর ‍মুখ বুজে সয়ে যেতে হবে না। আগামী বছর আমাদের জুলাই শহিদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের আবার এই প্রশ্ন করতে হবে না যে- ‘মুন্সিগঞ্জের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিরসন হলো কতটুকু?’

লেখক: হাসনাত সায়ের, সৌদি আরব থেকে। 

ফেইসবুকে আমরা
ইউটিউবে আমরা