ইতিহাস গড়ার পথে ‘পদ্মা সেতু’!
রুবেল ইসলাম: অবশেষে সব সংশয় কাটিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে জাতির স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি ইতিহাস গড়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এত গভীর আর বড় নদীতে বহুমুখী এ সেতু নির্মাণের রেকর্ড গড়ার বিশাল কর্মযজ্ঞে সরব এখন পদ্মার পাড়। দ্রুত সময়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত কাজের অগ্রগতি তদারকি করছেন, নিয়মিত খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত তিন বছরে ১৭৯ বার পদ্মা পাড়ে গিয়েছেন সেতুর কাজ পর্যবেক্ষণ করতে।
মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর উপরে ৭ নম্বর পিলারে মূল পাইলিং শুরু হবে। এটিই হবে সেতুর প্রথম মূল পাইল ড্রাইভিং। আগামী ১২ডিসেম্বর মাওয়ার এই ৭নং পিলার পয়েন্ট । এখান থেকেই সেতুর মূল পাইলিং উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এলক্ষ্যে এ পয়েন্টে পাইলিং কাজের সরঞ্জামাদি একসাথে স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে। এ সেতুর পাইলগুলোর ১২০ মিটার বা ৪০ তলা ভবনের সমান কাঠামো পানির নিচে থাকবে।
সব মিলিয়ে সেতুটির একেকটি পাইলের দৈর্ঘ্য হবে ১৫০ মিটার।
পদ্মা নদীর গর্ভে মাটিতে কাঁদার পরিমাণ বেশি। তাই এর চাপ ধারণ ক্ষমতা কম। পাইলগুলো এত গভীরে যাওয়ার এটা একটা বড় কারণ। পাইলগুলো আকারে হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যা রের্কড সৃষ্টি করবে।
এর আগে নদীর ওপর সারী সারী ৩-৪টি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নদী তীর থেকে ১০০০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল ক্রেনের মাধ্যমে মালপত্র উঠানামার কাজ চলছে। এতে করে পিলারের চতুর্দিককে ঘিরে নানা কর্মযজ্ঞ চলছে।
মূল সেতুর কাজের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা নদীর দুই পাড়ে সেতুর সংযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণ, মাঝনদীতে মাটি পরীক্ষার কাজও চলছে পুরোদমে।
প্রকল্প এলাকার দুইপারে দেশী বিদেশী এবং সবমিলিয়ে সামরিক বেসামরিক প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শ্রমিক এখন কাজ করছেন এখানে।
জার্মান থেকে মূল পাইলের হ্যামার মাওয়ায় পৌঁছার পর এই প্রস্তুতি অারও জোড়ালোভাবে বেড়ে গেছে। সিডিউল অনুযায়ী ৪ বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে এই কাজ। ইতোমধ্যে সেতুর কাজের অগ্রগতি হয়েছে ১৬.৪৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে মূল সেতুর কাজ হয়েছে ২৭ শতাংশ।
যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্প এলাকায় ঘন ঘন তদারকির মাধ্যমে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতির খোঁজখবর রাখছেন।
রোববার প্রকল্প এলাকায় ১৭৯তম সফরে গিয়েও তিনি বলেছেন,পদ্মা সেতু এখন আর একটুও স্বপ্ন নয়। এটি এখন দৃশ্যমান ও বাস্তব হতে চলেছে। ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
এদিকে সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে চলমান থাকায় প্রকল্প এলাকার নেওয়া হয়েছে জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রকল্প এলাকার কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নেয়া হয়েছে কড়া নিয়মাবলী।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাধারণ দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছে চায়না মেজর ব্রীজ ও সিনোহাইড্রোর যৌথ নিরাপত্তাকর্মীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, প্রকল্প এলাকার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের বিশাল ওয়ার্কশপ থেকে বের করে হুইলের মতো রেললাইন ধরে সেই পাইল বার্জে করে ক্রেনের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পদ্মায়।
প্রথমে ৬টি কেসিন নিয়ে একটি ব্যাজের ওপর জোগান গেড়ে প্ল্যটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে। এভাবেই সেতুর পিলার পয়েন্টে একের পর এক পাইলগুলো স্থাপন প্রক্রিয়া চলছে। নদীর মাঝখানে জেগে ওঠছে একের পর এক পাইলের প্ল্যাটফর্ম ।
গত কয়েকদিন থেকে পদ্মা নদীর তীর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার অদূরে বসানো হয়েছে ৩মিটার ব্যাসবিশিষ্ট একটি সার্ভিস পাইল অর্থাৎ পাইল কেসিন।
এটিই পদ্মা নদীর উপরে ৭ নম্বর পিলার যা পি-৭ নামে পরিচিত। এখান থেকেই শুরু হবে প্রথম মূল পাইলিংয়ের কাজ। এছাড়া এর ১৫০ মিটার পর পর আরো ৩টি পিলার মূল পাইলিংয়ের জন্য প্রস্তুতির কাজ চলমান রয়েছে।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের ৪২টি পিলারের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ এই সেতু।
এছাড়া দেড় কিলোমিটার করে উভয় পাড়ে তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর জন্য আরও ২৪টি পিলার হবে।
সেতুর ৪২টি পিলারে ৬টি করে ২৪০টি এবং দু’পাড়ের ১২টিতে দুটি করে ২৪টি পাইল বসাতে হবে। সর্বমোট ২৬৪টি পাইল হবে এ সেতুতে।
চায়না মেজর ব্রীজের নিয়োজিত শ্রমিক এমবিইসি-৪ ক্রেনের ফোরম্যান সুমন, রিগারম্যান নজরুল ও কবির হোসেন জানান, সেতুর পিলারের সয়েল টেষ্ট, টেষ্ট পাইল ও মূল পাইলিংয়ের জন্য পাইল কেসিন সেট করার কাজ যে হারে চলছে তাতে এই শুস্ক মৌসুমে সেতুর কাজ অনেক এগিয়ে যাবে বলে আমরা মনে করছি। কেননা শান্ত পদ্মায় শ্রমিকেরা এখন একটুও বসে নেই।
সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মোঃ আব্দুল কাদের জানান, গত কয়েকদিন থেকে মূল পাইলিংয়ের জন্য আনুসাঙ্গিক সবরকম যন্ত্রপাতি সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। একের পর এক সবগুলো পাইল ড্রাইভিংয়ের পরই পদ্মাসেতুর সুপার স্ট্রাকচারের কাজ শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হবে। এজন্য সিঙ্গাপুর থেকে আরো ২৫০০ টন থেকে ৪০০০ টনের আরো অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ৫টি ক্রেন আনা হচ্ছে।
এদিকে আসছে ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনের কাজ উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে জাজিরা পয়েন্টে নদী শাসনের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
মাঝিকান্দি, নাওডোবাসহ নদীর দুই পাড়ে কয়েক লাখ ব্লক তৈরীসহ বস্তা, বড় বড় পাথরসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি স্তুুপাকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
মূল পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দুই তলা বিশিষ্ট এ সেতুর নিচ তলা দিয়ে রেল ও ওপর তলা দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে।
সেতুর পাশাপাশি নদী শাসনের লক্ষ্যে ড্রেজিং কাজও চলছে বলে জানান সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (নদীশাসন) সরফুল ইসলাম সরকার।


