২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
শুক্রবার | রাত ১:২৭
আজ মুন্সিগঞ্জের ভবেরচর গণহত্যা দিবস
খবরটি শেয়ার করুন:
302

মুন্সিগঞ্জ, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫, (আমার বিক্রমপুর)

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচরে এক ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। পাক বাহিনী যুদ্ধের নয় মাসে ঢাকা-চট্টগ্রামে মহসড়কে যত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ভবেরচর গণহত্যা।

একাত্তরে হানাদারদের ভয়াল গ্রাসের মুখে পড়া এক গ্রাম ভবেরচর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এখানে মুক্তি-সংগ্রামের দানা বাঁধতে শুরু করে। তাই দখলদার বাহিনী শুরু থেকেই এই গ্রামকে বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখে। এই গ্রামের পুবদিকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সামরিক ভাষায় এ মহাসড়ককে বলা হতো এমএসআর বা মেইন সাপ্লাই রুট।

পাকিস্তানিদের সমস্ত রসদ প্রবেশ করে এই সড়ক দিয়ে। ফলে হানাদার বাহিনী যেকোনো কিছুর বিনিময়ে সড়কটি সচল রাখতে চাইত। অন্যদিকে গেরিলাদের প্রধান কাজ ছিল সেতু-কালভার্ট উড়িয়ে দিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এ নিয়েই মূলত দখলদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিকামী মানুষের মূল সংঘাত।

১৯৭১ সালে ৩০ আগস্ট স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এক্সপ্লোসিভ বিফোরণের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভবেরচর সেতুটি উড়িয়ে দেয়। হানাদার বাহিনী সেখানে কাঠের সেতু তৈরি করে। সেতুর পাশে সেমি ক্যাম্প স্থাপন করে তল্লাশির নামে প্রতিদিন যাত্রীদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় ও অসহায় নারীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। এক দিন হানাদাররা এই গ্রামের স্কুলপড়ুয়া এক ছেলেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গণবলাৎকার করে মারে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ ফুলে, ফুঁসে ওঠে। এক রাতে এলাকাবাসী সেতুটিতে আগুন দেয়। কিন্তু সামান্য আগুনে তা পোড়ানো সম্ভব হয় না। তাই পরদিন ভোরবেলা থেকে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা সেতুটি ভাঙতে শুরু করে। সেখানে হঠাৎ চলে আসে রক্তপিপাসু হানাদারের দল। মাইক্রোবাস থেকে নেমেই তারা দানবীয় উল্লাসে মেতে ওঠে।

সেদিন ছিল ৭ ডিসেম্বর। ফজরের আজানের পর থেকেই অসংখ্য মানুষ হাতুড়ি, শাবল, কুড়াল, খুন্তিসহ নানা ধরনের যন্ত্র নিয়ে ভবেরচর ঈদগাঁয়ে এসে জড়ো হয়। যে যার মতো সেতু ভাঙতে শুরু করে। সেতুর দুদিকে ছিল গেরিলাদের সতর্ক অবস্থান। এক দল গেরিলা অ্যামবুশ করে ছিলেন আলীপুরা গ্রামের মাথায়। আর মধ্যবাউশিয়া গ্রামে সশস্ত্র অবস্থানে ছিল অন্য একটি দল।

পুরান বাউশিয়া গ্রামেও ওত পেতে ছিলেন কয়েকজন গেরিলা। তখন সকাল সাড়ে ১০টা। সেতু ভাঙাও প্রায় শেষের দিকে। হঠাৎ ঢাকার দিক থেকে রেড ক্রসের লগো-সংবলিত একটি মাইক্রোবাস গেরিলাদের অ্যামবুশ সীমানা ছাড়িয়ে দ্রুত আলীপুরা সেতুর কাছে চলে আসে। মাইক্রোবাসটি আলীপুরা সেতু পেরিয়ে একটু সামনে গিয়ে থামে। কিন্তু এটি যে হানাদার বহনকারী মাইক্রোবাস, তা বুঝতে গেরিলাদের সময় লেগে যায়। যখন বোঝা গেল তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

আলীপুরার দিকে শিলার মতো গুলি আসছে। একটু থেমে আবার বিরামহীনভাবে গুলি হচ্ছে। কড়ই, শিমুল আর শিশুগাছের ডালপালা ভেঙে মাটিতে পড়ছে। কান-ফাটা শব্দে সুন্দর সকালটা কর্কশ হয়ে ওঠে। লোকজন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাচ্ছেন। কী করবে, কোন দিকটায় যাবে বুঝতে পারছে না। সবার মাথায় একটাই চিন্তা জান বাঁচানো। কেউ সেতুর ওপর থেকে লাফিয়ে খালে পড়ছেন। কেউবা পাশের ডোবায় ঝাঁপ দিয়েছেন। বালুধুমের মাঠ পেড়িয়ে কোনো রকমে ভবেরচর বাজারে পৌঁছাতে পারলে আর বিপদ থাকে না।

ভয়ার্ত লোকজন পিঁপড়ার ঝাঁকের মতো বাজারের দিকে ছুটতে থাকেন। ইতোমধ্যে বাজারের অধিকাংশ দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে শক্তি কমে যাওয়া গুলি এসে পড়ছে টিনের চালে। যেভাবে গুলি আসছে তাতে এখন আর বাজারও নিরাপদ নয়। দিশেহারা মানুষ করিমখাঁ, হোগলাকান্দি, বাঘাইকান্দি, কালীপুরা আর আন্ধারমানিকের দিকে ছুটছে। এরপর আর যাওয়ার জায়গা নেই; সামনে বিস্তৃত মেঘনা। গুলির শব্দে গ্রামগুলো কেঁপে উঠছে। মানুষ এরপর কোথায় যাবে দিশা পাচ্ছে না।

গুলি থেকে মাথা বাঁচিয়ে সবাই পালিয়ে যেতে পারলেও নির্জন কবরস্থানে আশ্রয় নিতে গিয়ে আটকা পড়েন ১৩ জন নিরস্ত্র মানুষ। হানাদার বাহিনী সেখানে গিয়ে জালের মতো বেড়ি দিয়ে এদের খুঁজে বের করে। গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ১১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এদের ৯ জনই ওই হতভাগ্য কিশোর।

ঘাতকের দল এই কিশোরদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় না; তাদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। কিশোরদের বিবস্ত্র করে পুরুষাঙ্গ কেটে দেয়। চোখ উপড়ে ফেলে। দেহ থেকে হাত ও আঙুল বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেদিন গণহত্যার শিকার হন আবদুল আউয়াল সরকার, মতিউর রহমান জাহাঙ্গীর, শাহাদত হোসেন, শাহজালাল মৃধা, রুহুল আমীন সরকার, উমেশ চন্দ্র মালি, নূর মাহাম্মদ ব্যাপারী, নূরুল ইসলাম ও গোলাম হোসেন নামের ৯ কিশোর। হানাদাররা ওই দিন ভবেরচর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক মো. ইসমাইল সরকার ও হরিপদ চক্রবর্তী নামের একজন স্বর্ণকারকে হত্যা করে।

ভবেরচর গণহত্যা যে আকস্মিকভাবে হয়েছে তা নয়, বরং এই গণহত্যা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। পাকিস্তানি হানাদাররা আগে থেকেই এই এলাকার মুক্তিকামী যুবকদের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ ছিল। এখানকার ১৪ জন বিদ্রোহীপ্রাণ যুবকের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি মার্শাল ল’ আদালত হুলিয়া জারি করে।

ভবেরচর আমার নিজের গ্রাম। এই গ্রামের আলো-বাতাস আর মুক্তিযুদ্ধের করুণ কাহিনী শুনে শুনে আমি বড় হয়েছি। একাত্তরে হানাদারদের থাবা থেকে এই গ্রামকে মুক্ত করার জন্য যে অকুতোভয় ৯ বীর কিশোর নিজেদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সম্পৃক্ত করেছিলেন; তাদের প্রতি আমার আজন্ম ঋণ।

একাত্তরে এই বীর কিশোরদের প্রাণবিয়োগের কারণে লোকে ভবেরচরকে বলে শোকের গ্রাম। প্রতি বছর ঘুরে-ফিরে আসে ৭ ডিসেম্বর। এ দিন স্বজনহারা মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের বুকে শোকের ঢেউ খেলে যায়। প্রিয়জনহারা মানুষগুলো এ দিন কবরস্থানের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। দোয়া-দুরুদ পড়েন; নীরবে চোখের জল ফেলেন। ভবেরচর সেতুর সামনে গিয়ে বুক চাপড়ে আহাজারি করেন। বেদনায় কুঁকড়ে ওঠেন কত নৃশংস ছিল ওরা; সেই কথা মনে করে।

লেখক: সাহাদাত পারভেজ, আলোকচিত্রী, গবেষক ও শিক্ষক
shahadatparvezpix@gmail.com