সদরঘাট কিংবা নারায়ণগঞ্জের চেয়েও পুরোনো মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাট- ইতালি, ফ্রান্স ও লন্ডনের সঙ্গেও হতো ব্যবসা
মুন্সিগঞ্জ, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, রমজান মাহমুদ (আমার বিক্রমপুর)
কমলাঘাট বন্দর। সমগ্র পূর্ববাংলায় এক সমৃদ্ধ নৌ বন্দর। ধারণা করা হয় এ বন্দরের শুরুটা হয় মোঘল আমলে, আর বৃটিশ সময়কালে এর পরিধি ব্যাপকতা লাভ করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকাররা এখানে পণ্য কেনাবেচার জন্য আসতেন। নদীপথে সহজে পণ্য পরিবহন করা যেত বলে বন্দরটির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। যেসব পণ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল
কমলাঘাট বন্দর এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—সুপারি ও নারকেল, মরিচ ও বিভিন্ন মসলা, চাল, ডাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য, গুড় ও তেল, আটা-ময়দা এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য। দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌপথে পণ্য আসত। এসব পন্যকে কেন্দ্র করে বন্দরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য আড়ত, গুদাম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহের পাশাপাশি এখানকার ব্যবসায়ীদের কলকাতা, আসাম,বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), ইতালি, ফ্রান্স ও লন্ডনের সঙ্গেও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।
এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কমলাঘাটের ব্যবসায়ীদের সমৃদ্ধি ও বন্দরটিরকে ঐতিহাসিক গুরুত্বের পরিচয় বহনে অবদান রাখে।
কমলাঘাট নামকরণে যে জনশ্রুতি শোনা যায়, একসময় এখানে কমলার বেশ কিছু আড়ত ছিল। এসব আড়তে কমলা কেনাবেচা হতো। আড়ত হতে নষ্ট কমলা মিরকাদিম খাল ও ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হতো। সেসব কমলা নদীর পানিতে ভেসে বেড়াতো। তাই স্থানীয়দের কাছ এ ঘাটকে কমলার ঘাট নামে পরিচিতি এনে দেয়। আর কমলার ঘাট থেকে কমলাঘাট নামের উৎপত্তি। এই কমলার আড়ত ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই যে জায়গাটির নাম কমলাঘাট হয়েছে তা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
মিরকাদিম ও কমলাঘাটের বাণিজ্যিক ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্য কেন্দ্রটি মিরকাদিম অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। আর মিরকাদিম বন্দর প্রাচ্যের সুয়েজ খাল খ্যাত মিরকাদিম খালের তীরে গড়ে উঠা একটি বাণিজ্যিক শহর। মিরকাদিম বন্দরের নৌ যোগাযোগ ভাটা পরলে এ জৌলুস কমতে থাকে। ধলেশ্বরী নদীর প্রবাহ ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণে পরবর্তীতে ব্যবসায় টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের অনেকে আড়ত নদীর কাছাকাছি কমলাঘাট নামক স্থানে স্থানান্তর করে সেখানে স্থায়ী হয়। এভাবেই মিরকাদিম হতে কমলাঘাট বন্দরের উদ্ভব হয়। ইংরেজ সময়কালে বৃহত্তর মিরকাদিম বলতে মিরকাদিম হাট, কমলাঘাট, রিকাবীবাজার, কাঠপট্টি ও বিনোদপুর ও ফিরিঙ্গীবাজারকে বুঝাতো। বর্তমান ফিরিঙ্গীবাজারের অস্তিত্ব আর নেই! ইংরেজ সময়কালের শেষের দিকে ফিরিঙ্গীবাজার ইছামতি ও ধলেশ্বরী নদীর ভাঙ্গনের শিকার হয়।
মোঘল আমলে কারা পুরনো ব্যবসায়ী ছিলেন এ বন্দরে তা নিরুপন করা বর্তমান কঠিন। তবে ইংরেজ সময়কালে পাল, মণ্ডল, কুণ্ডু, তালুকদার ও বসাক সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের নাম জড়িয়ে আছে কমলাঘাট বন্দরের সাথে। তাঁরা অনেকে বড় বড় আড়ত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। বন্দরের অতীত ঐশ্বর্যের স্মারক হিসেবে পুরোনো ব্যবসায়িক ভবন ও ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো এখনো টিকে রয়েছে। এর মধ্যে টোকানী পালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাধাশ্যাম নিকেতন উল্লেখযোগ্য। মিরকাদিম বন্দরে যারা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন তাদের আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল আব্দুল্লাপুর, পানাম, উত্তর পাইকপাড়া, মুরমা, নগর কসবা, কাজী কসবা, এনায়েতনগর, গোপালনগর, রামগোপালপুর, কালিন্দীপাড়া ও গোবিন্দনগর প্রভৃতি অঞ্চলে। এসব ব্যবসায়ী কতোটা প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তা এসব অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়।
কমলাঘাট বন্দরকে ব্যবসায় ধরণ ও অবস্থান অনুযায়ী মনোহারি পট্টি, গুড় পট্টি ও আড়ত পট্টিতে বিভক্ত করা হয়েছিল। এই পট্টিগুলোকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের পৃথক পরিচিতি গড়ে উঠেছিল। মনোহারি পট্টিতে পাওয়া যেতো-সুগন্ধি, সাবান, প্রসাধনী ও অন্যান্য শৌখিন সামগ্রী; গুড়পট্টিতে ছিলো গুড় এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবসা আর আড়তপট্টিতে ছিলো-পাইকারি পণ্য কেনাবেচা, মজুত ও সরবরাহ। পাইকাররা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পট্টিতে গিয়ে তাদের পছন্দ ও প্রয়োজানুযায়ী পণ্য কিনতেন।
এ বন্দরের ধস নেমেছে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির মধ্যে দিয়ে। কমলাঘাট বন্দরে ইংরেজ সময়কালে অধিকাংশ বনেদি ব্যবসায়ী ছিলেন হিন্দু। যারা সাতচল্লিশে দেশ বিভক্তির সময় ওপারে চলে যান। পাকিস্তান সময়কালে কিছু হিন্দু ও মুুসলমান মিলে বন্দরটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে কমলাঘাট বন্দরে প্রায় ৫০০–৬০০টি শিল্পকারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে তা এসে দাঁড়ায় ২০-২৫ টিতে। এ বন্দরের আজকের এ অবস্থানের জন্য মূলত দায়ী দেশ বিভাগের কারণে অধিকাংশ পুরনো ব্যবসায়ীর ব্যবসা গোটানো, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, সড়ক পথে উন্নত যোগাযোগ গড়ে না উঠা, সুযোগ সুবিধার অভাবে দেশ ও বিদেশ হতে পাইকারদের আগমন কমে যাওয়া। রাজধানী ঢাকার সদরঘাট বা বাদামতলী হতেও কমলাঘাট অধিক পুরনো বন্দর। আর নারায়ণগঞ্জ বন্দরের ব্যবসায় গড়ে উঠেছিল কমলাঘাট বন্দরের ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই। অথচ বিক্রমপুরের সে পুরনো বাণিজ্য বন্দরটি আজ বিলুপ্তির পথে।
কমলাঘাটের ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ এটি শুধু একটি বন্দরের ইতিহাস নয়—এটি বৃহত্তর বিক্রমপুরের অর্থনীতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন এবং স্থানীয় সমাজের পরিবর্তনের ইতিহাস। অথচ সে ইতিহাস সংরক্ষণে নেই কারো আন্তরিকতা! সংস্কৃত মন্ত্রণালয় কিংবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা ও উদ্যোগ কমলাঘাট, মিরকাদিম, নগরকসবা, পানাম, আব্দুল্লাপুর ও গোপালনগর নিয়ে হতে পারতো বিক্রমপুরের একটি পর্যটন নগরী। যা অবহেলা আর অযত্নে হাঁরিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। প্রজন্মের উত্তরসূরি হিসেবে আমরা কি দায় এড়াতে পারি?
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।









