ইতালিতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন: নেপথ্যে দুই নারী ও টাকার দ্বন্দ
1

মুন্সিগঞ্জ, ১ মে ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের দুই ইতালি প্রবাসী ভাইয়ের পারিবারিক বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী পরিণতিতে গড়িয়েছে। ইতালির লেচ্চে শহরে বড় ভাই হুমায়ুন ফকিরের (৩৫) ছুরিকাঘাতে ছোট ভাই নয়ন ফকির (২৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিহতের পরিবার এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে।

নিহত নয়ন ফকির ও অভিযুক্ত হুমায়ুন ফকির টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পশ্চিম সোনারং এলাকার দেলোয়ার ফকিরের ছেলে।

শুক্রবার দুপুরে দেলোয়ার ফকিরের বাড়িতে গেলে তিনি এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ইতালির লেচ্চে শহরে বড় ভাই হুমায়ুন ফকির উত্তেজিত হয়ে ছোট ভাই নয়ন ফকিরকে ধারালো ছুরি দিয়ে পেছন থেকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই নয়নের মৃত্যু হয়।

ছোট ভাইকে হত্যার পর হুমায়ুন ভিডিও কলের মাধ্যমে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন। সেই ভিডিও কলে তিনি নয়ন ফকিরের রক্তাক্ত মরদেহ স্বজনদের দেখান এবং নিজেই তাকে খুন করেছেন বলে স্বীকারোক্তি দেন। স্বজনরা মোবাইলের স্ক্রিনে নয়নের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।

শুক্রবার সরেজমিনে সোনারং গ্রামে নিহত নয়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। বাড়িতে ভিড় করছেন উৎসুক এলাকাবাসী ও স্বজনেরা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হুমায়ুন ও নয়ন দুই ভাই। তাঁদের একমাত্র বোন দিলারা আক্তার। ৮-৯ বছর আগে অবৈধপথে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যান হুমায়ুন। পরে চার বছর আগে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করে ছোট ভাই নয়নকে একইভাবে ইতালিতে নিয়ে যান।

সম্প্রতি বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য বিভিন্ন সময়ে দেওয়া ১৬ লাখ টাকার অর্ধেক, অর্থাৎ ৮ লাখ টাকা নয়নের কাছে দাবি করেন হুমায়ুন। নয়ন সেই টাকা দিতেও রাজি ছিলেন। এর মধ্যেই হুমায়ুনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে পরিবারে নতুন করে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

স্বজনেরা জানান, হুমায়ুন দ্বিতীয় বিয়ে করার পর তাঁর বাবা দেলোয়ার ফকির নতুন স্ত্রীকে বাড়িতে তোলার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে ক্ষোভে হুমায়ুনের ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। পরিবার মনে করছে, এসব বিষয় নিয়েই হুমায়ুন ক্ষুব্ধ ছিলেন।

নিহতের বোন দিলারা আক্তার বলেন, নয়ন সব টাকা পরিশোধ করেছিল। এমনকি আরও ৮ লাখ টাকা দিতেও রাজি ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই হুমায়ুনের সঙ্গে পরিবারের বিরোধ বাড়তে থাকে। হত্যার দিন আগে থেকেই ছুরি নিয়ে ওঁত পেতে ছিল সে। নয়ন সাইকেল চার্জ দিতে গেলে পেছন থেকে পিঠে এবং পরে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়।

হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন বলেন, প্রায় তিন বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বিয়ের আগ থেকেই হুমায়ুনের নিজের এক আত্মীয় নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। পরে দেশে এসে সেই নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করে আবার ইতালিতে চলে যান। সে আমাকে ঠিকমতো ভরণপোষণ দিত না। বিভিন্ন সময় মানসিক নির্যাতন করত। বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাপ দিত। বলত, মামলা না করলে কাবিনের ৫ লাখ টাকা দেবে এবং ছেলের জন্য প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পাঠাবে। ১৫ দিনের মধ্যে চলে যাওয়ার শর্তে আমি সম্প্রতি তাকে তালাক দিতে রাজি হই।

হুমায়ুনের মা বিউটি বেগম বলেন, হুমায়ুন নয়নকে ইতালি নেওয়ার সময় টাকা খরচ করেছিল। কিন্তু নয়ন পরে তার চেয়ে বেশি টাকা দিয়েছে। এরপরও বাবা-মায়ের জন্য দেওয়া টাকার অর্ধেক চাইছিল। নয়ন তাতেও রাজি ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে পারিবারিক ঝামেলার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

অভিযুক্ত হুমায়ুন ফকিরের দ্বিতীয় স্ত্রী তায়েবা আক্তার বলেন, আমার সাথে তার বিয়ের আগ থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। তাই আমরা ৮-৯ মাস আগে বিয়ে করেছি। তবে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ পাওনা টাকা নিয়ে।

টংগিবাড়ী থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দুই দিন আগে ইতালি থেকে থানায় ফোন করেছিলেন হুমায়ুন। তিনি দাবি করেন, ছোট ভাইয়ের কাছে তাঁর ১৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। পুলিশ তাঁকে জানায়, লিখিত অভিযোগ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। পরে তাঁর প্রথম স্ত্রীকে দিয়ে পরিবারের কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করানো হয়।

পুলিশের ধারণা, দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে হুমায়ুনের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। প্রথম স্ত্রীকে বাড়ি ছাড়তে চাপ দেওয়াকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা তৈরি হয়। এসব বিষয় নিয়ে তিনি পরিবার ও ভাইয়ের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

টংগিবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম ডাবলু বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে এক ভাইয়ের হাতে আরেক ভাই ইতালিতে খুন হয়েছে, এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে কোন অভিযোগ পেলে পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ