আশুতোষ গাঙ্গুলী: যার হাত ধরে ৮৮ বছরের হরগঙ্গা কলেজ
মুন্সিগঞ্জ, ৮ জুন ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্ট (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ইতিহাসে সরকারি হরগঙ্গা কলেজ একটি গৌরবময় নাম। প্রায় নয় দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এক মহান শিক্ষানুরাগীর নাম—শ্রী আশুতোষ গাঙ্গুলী।
শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন
ব্রিটিশ শাসনামলে মুন্সিগঞ্জে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই বাস্তবতায় টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ধীপুর ইউনিয়নের রাউতভোগ গ্রামের বাসিন্দা শ্রী আশুতোষ গাঙ্গুলী একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা।
এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি তৎকালীন প্রশাসন, শিক্ষাবিদ ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেন। স্থানীয় আইনজীবী শ্রী সতীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এবং তৎকালীন মুন্সিগঞ্জ মহকুমার উপবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট এ.এইচ.এম. ওয়াজির আলীসহ অনেকেই তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
এক লাখ রুপির দানে কলেজ প্রতিষ্ঠা
আশুতোষ গাঙ্গুলী নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এক লাখ রুপি অনুদান প্রদান করেন, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ। তাঁর এই দান ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই প্রতিষ্ঠিত হয় হরগঙ্গা কলেজ।
কলেজটির নামকরণ করা হয় তাঁর পিতা শ্রী হরনাথ গাঙ্গুলী এবং মাতা গঙ্গাশ্বরী দেবীর নামের প্রথম অংশ নিয়ে। পিতা-মাতার স্মৃতিকে ধারণ করে ‘হরগঙ্গা কলেজ’ নামটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
শেরে বাংলার হাতে ভিত্তিপ্রস্তর
১৯৩৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মধ্য দিয়ে মুন্সিগঞ্জে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।
পরের বছর, ১৯৩৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। কলেজটির প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রী বিরেন্দ্র চন্দ্র মুখার্জী, যিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সমসাময়িক ছিলেন।
শিক্ষা ও আবাসন সুবিধার প্রসার
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কলেজটি শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা চালু ছিল।
১৯৪২ সালে কলেজ পুকুরের উত্তর পাশে একটি তিনতলা ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। একই সময়ে আশুতোষ গাঙ্গুলী তাঁর পূর্বের অনুদানের অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার রুপি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে লৌহজং উপজেলার ডহরি গ্রামের দানশীল ব্যক্তি মোহাম্মদ আলী সিনহার অনুদানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। এ ধরনের উদ্যোগ সে সময়ের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে এর অবকাঠামো সম্প্রসারিত হতে থাকে। ১৯৬২ সালে অধ্যক্ষ ও খ্যাতিমান নাট্যকার আযীম উদ্দিন আহমেদের উদ্যোগে কলেজে একটি মসজিদ ও ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের পিতা।
১৯৬৬ সালে অধ্যক্ষ জি. এম. এ. মান্নানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় অধ্যক্ষের সরকারি বাসভবন। পরবর্তী সময়ে কলেজে একের পর এক একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস ও অন্যান্য স্থাপনা যুক্ত হয়।
জাতীয়করণের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়
১৯৮০ সালের ১ মার্চ কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। এর মাধ্যমে সরকারি হরগঙ্গা কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের নতুন যাত্রা শুরু হয়।
জাতীয়করণের পর কলেজে শিক্ষার পরিধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও গতিশীল হয়। নতুন নতুন বিভাগ চালু হওয়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার সুযোগও বিস্তৃত হতে থাকে।
আধুনিক হরগঙ্গা কলেজ
বর্তমানে সরকারি হরগঙ্গা কলেজ মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে। কলেজটি এখন জেলার হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত।
আশুতোষ গাঙ্গুলীর উত্তরাধিকার
প্রায় ৯০ বছর আগে আশুতোষ গাঙ্গুলী যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তা একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাঁর দান, দূরদৃষ্টি এবং শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসা শুধু একটি কলেজই গড়ে তোলেনি, বরং মুন্সিগঞ্জের শিক্ষা ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
সরকারি হরগঙ্গা কলেজের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ এবং হাজারো শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্পে আজও বেঁচে আছেন এই মহান শিক্ষানুরাগী। তাই ইতিহাসের পাতায় আশুতোষ গাঙ্গুলীর নাম শুধু একজন দাতা হিসেবে নয়, বরং মুন্সিগঞ্জের উচ্চশিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।









