বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ: শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা এখনো সাংবাদিকদের হাতে নেই কেন?
29

মুন্সিগঞ্জ, ৩ মে ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

লেখক: শিহাব আহমেদ, সাংবাদিক

শিরোনামের প্রশ্নটা বেশ কঠিন। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সরল-সহজ। শুরু করি শুরু থেকেই। মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য যে সাংবাদিকের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ আর নিরাপত্তা অন্যতম নিয়ামক তা বোধ করি কেউ অস্বীকার করবেন না।

আরও সহজভাবে বলতে পারি যে, এবারে এ দিবসের প্রতিপাদ্য যেখানে এ শব্দবন্ধগুলোর সাহায্যে এসেছে অস্বীকার করার কি আছে! বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’। এবারে বিষয়টি আর সাংবাদিক পর্যন্ত আবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে গেছে মানবাধিকার, উন্নয়ন ও সার্বিক নিরাপত্তা পর্যন্ত।

অর্থাৎ আমাদের পৃথিবীর-রাষ্ট্রের- সমাজের-মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার ঘটানো আবশ্যক এবং গুরুত্বপূর্ণ। আবার দেখুন, উন্নয়ন ও নিরাপত্তায়ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়টি সামনে এসে যাচ্ছে। কিন্তু সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের মূল চালিকাশক্তি যারা অর্থাৎ সাংবাদিকরা তারা কি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এখনও পেয়েছেন? নাকি এসবের জন্য এখনও তাদের ক্ষমতাসীনদের কাছে মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে? বাস্তবতা কি?

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ কি এখন ভয়মুক্ত? উত্তর হচ্ছে ‘না’। এখনও আমাদের দেশে ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ গড়ে উঠেনি। পূর্বের ‘আত্মসমর্পণের ধারা’ আমাদের মধ্যে যতটা না বিদ্যমান তার চেয়েও বেশি বিদ্যমান দেশের গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে। সেটা যে থাকাই উচিৎ তার প্রমাণ এদেশের জনপ্রিয় দুই গণমাধ্যম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া, ভাঙচুর-লুট চালানোর ঘটনা।

আমরা আত্মসমপর্ণ করছি কারণ আমরা যাদের উপর স্থানীয়ভাবে নির্ভরশীল বা যাদের ভূমিকায় নিরাপত্তাবোধ করতে পারি বা আশ্বস্ত হই তারা ঠিক আগের মতই ক্ষমতাসীনদের প্রতি ঝুঁকে আছেন। সেটা যতটা না পেশাদারিত্বের কারনে তার চেয়েও বেশি পারিপার্শ্বিকতার জন্যে। ‘সংঘবদ্ধ চাপ সৃষ্টি’ বা ‘নির্দিষ্ট পরিচয়ে চিহ্নিত’ করা এখন সামাজিক প্রচলন বা স্বাভাবিকীকরণ পর্যায়ে রয়েছে।

কতৃত্ববাদী যে সরকারটিকে অভ্যুত্থানের মুখে পরাজয় মানতে হলো সেই সময়ের সাংবাদিকতায় আতঙ্কের নাম ছিলো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’। সেটা যেমন দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য সহজলভ্য ছিলো এখনকার দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে সহজলভ্য হয়েছে শারিরীক বা মানসিক আক্রমণ। তাই এই আলোচনা সামনে আসছে যে, নিরাপত্তা এখনো সাংবাদিকদের হাতে নেই।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা যখন থাকছেন তাদের সহানুভূতির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই কিছুটা আশা জেগেছিল, যখন পরিবর্তনকামী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই কমিশন গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের পরিবেশগত উন্নয়নে বেশ কিছু জাকজমক সুপারিশ উপস্থাপন করেছিলো।যার মধ্যে আলোচিত ছিলো- ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা’য় অধ্যাদেশ।

সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় উদ্যোগটি সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল এবং আগ্রহের কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই আমাদের আশাহত করেছে যে, তারা এই কমিশনের কোন সুপারিশই বাস্তবায়ন করেনি। কেন বা কোন কারণে করেনি সেটিও সেই সরকারের কেউ আলোচনায় আনেনি। আমাদের গণমাধ্যমগুলো এ বিষয় এড়িয়ে গেছে আরও সচেতনভাবে। এ নিয়ে যতটা আলোচনা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে হওয়ার কথা ছিলো তা হয়নি।

নতুন, নির্বাচিত, অভিজ্ঞ আইনপ্রণেতাদের নিয়ে গঠিত সরকারের এ নিয়ে কি ভাবনা তা জানার আগ্রহ থাকলেও এখন পর্যন্ত আলোচনাটি শোনা যায়নি। ফলে, সংবাদ প্রকাশের জেরে নিরাপত্তা দপ্তর বা বিচারালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাও থামেনি।

সাংবাদিকতার উদ্দীপনা এখনো ধরাশায়ী ভয়ের পরিবেশের কাছে। আর এই পরিবেশের কাছে ধরাশায়ী শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ।

এর মধ্যে মানুষের প্রতিক্রিয়া জানানোর আচরণে মানসিক পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সাভারে কর্মরত প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামানকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর যে প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ দেশজুড়ে হয়েছে তার ছিটেফোটাও প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার পর হয়নি। তখন সারাদেশের যেসকল সাংবাদিক সহকর্মীরা প্রতিবাদ জানালো তারা কি এখন এ দেশে নেই? তাহলে প্রতিবাদ হলো না কেন? কারণ মানসিক ভয়। ‘সংঘবদ্ধ চাপ সৃষ্টি’ বা ‘নির্দিষ্ট পরিচয়ে চিহ্নিত’ করার ভয়। এই ভয় আগের চেয়ে দ্বিগুন।

মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতায় এসব রাখঢাকের বিষয় নয় বরং স্পষ্ট ও প্রকাশ্য।

স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা প্রশাসনিক অসহযোগিতার মুখে একজন জেলা বা উপজেলা সাংবাদিক প্রায়ই একা হয়ে পড়েন। চাকরির অনিশ্চিয়তা, বেতন বৈষম্য ও নিয়োগপত্রহীন অবস্থায় কাজ করতে গিয়ে অর্থনৈতিক অনিরাপত্তায় পড়েন সাংবাদিক। এর মধ্যে ভেতরকার বিভক্তি, আক্রমণকে রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা, পেশাগত অধিকারের জন্য হুমকি হয়ে যায়।

আসলে, সাংবাদিক যদি প্রতিনিয়ত ভয় নিয়ে বাঁচেন, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় ভয় নিয়েই বাঁচতে শেখে।

বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়লেও বাংলাদেশে এ আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন এখনও সীমিত।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ