বিক্রমপুরের তিন সূর্যসন্তান: বিনয়, বাদল ও দীনেশের বীরত্বগাথার দিন আজ
মুন্সিগঞ্জ, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, আরাফাত রায়হান সাকিব (আমার বিক্রমপুর)
বিংশ শতাব্দীতে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ধারা ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন। মূলত এই সশস্ত্র বিপ্লব দুটি ধারায় গড়ে উঠেছিল। প্রথমটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই পরবর্তীকালে ভারত স্বাধীন হয়।
অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা থেকেই অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স প্রভৃতি বিপ্লবী দলগুলো ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিল। এই বিপ্লবীদের মধ্যে অনন্য ও অবদানের দিক থেকে অন্যতম ছিলেন বিক্রমপুরের তিন সূর্যসন্তান – বিনয়, বাদল ও দীনেশ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই তিন বিপ্লবী কিশোর বয়সেই দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।
বিনয় বসুর জন্ম ১৯০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার রোহিতভোগ (বর্তমান রাউৎভোগ) গ্রামে। তাঁর পিতা রেবতীমোহন বসু ছিলেন একজন প্রকৌশলী। ঢাকায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করার পর তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) ভর্তি হন। এ সময় ঢাকার বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে এসে তিনি যুগান্তর দলের সাথে জড়িত হয়ে মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন। মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় বিপ্লবীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৯৩০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এফ জে লোম্যানকে হত্যা করে পালিয়ে যেতে সফল হন।
বাদল গুপ্তের জন্ম ১৯১২ সালে একই উপজেলার সিমুলিয়া গ্রামে। তাঁর আসল নাম সুধীর গুপ্ত। পিতা ছিলেন অবনী গুপ্ত। তার পিতৃব্য নরেন্দ্র গুপ্ত ও ধরণী গুপ্ত মুরারীপুকুর বোমা হামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। পারিবারিকভাবেই রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন বাদল গুপ্ত। এই পরিবেশেই তাঁর পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করে। স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনার সময় তাঁর শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের সংস্পর্শে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯২৯-৩০ সালে তাঁর প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সরকারের অন্যতম অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস, বার্জ এবং পেডিকে হত্যা করে। ব্রিটিশ সরকারের আতঙ্কে পরিণত হন।
বিক্রমপুরের তিন বিপ্লবী বীরের আরেকজন দীনেশ। ১৯১১ সালের ৬ ডিসেম্বর একই উপজেলার যশলং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সতীশচন্দ্র ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মচারী। বিনোদিনী দেবী ছিলেন গৃহিণী। বাল্যকাল থেকেই দীনেশ ছিলেন নির্ভীক ও স্বাধীনচেতা। এই সময় থেকেই তাঁর মনে স্বদেশচেতনা ও ব্রিটিশ-বিরোধিতার আদর্শ সঞ্চারিত হয়েছিল। দশম শ্রেণিতে পড়াশোনাকালে তিনিও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেন।
১৯৩০ সালের দিকে ব্রিটিশরা সবচেয়ে বেশি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। এ সময়ে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। অলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বিপ্লবী নেতাদের ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকারের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোর কেন্দ্রস্থল ঐতিহাসিক “রাইটার্স বিল্ডিং” আক্রমণ করে ঐ অত্যাচারের মূলহোতা সিম্পসনসহ অত্যাচারী অন্যান্য কর্মকর্তাদের একই সাথে শাস্তি দেওয়ার। নির্বাচিত হলেন এই কাজের সবচেয়ে উপযোগী বিনয়-বাদল-দীনেশ। আর এই আক্রমণই ছিল ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সাহসী আক্রমণ।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনজনই হাজির হন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে। ঠিক ১২টা বাজে। সিম্পসনের সহকারীকে ধাক্কা দিয়ে তারা তিনজন সিম্পসনের সামনে দাঁড়ান। বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় “Pray to God Colonel your hour has come”। ঘটনার আকস্মিকতা বুঝে ওঠার আগেই তাদের রিভলবারের গুলিতে সিম্পসন লুটিয়ে পড়েন। গুলির আওয়াজে তখন রাইটার্স বিল্ডিং জুড়ে আতঙ্ক।
এগিয়ে আসেন জুডিশিয়াল সেক্রেটারি মি. নেলসন, মি. টয়নবি – তারা বিপ্লবীদের গুলিতে আহত হয়ে পড়ে রইলেন বিল্ডিংয়ের বারান্দায়। এর মধ্যেই সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে ফেলে রাইটার্স বিল্ডিং। উভয় পক্ষের মধ্যে চলে গুলি বিনিময়। কিন্তু ফুরিয়ে যায়।
শত্রুর গুলিতে মরার চেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তারা। একটি শূন্য ঘরে প্রবেশ করে সঙ্গে আনা “সায়ানাইড” বিষ পান করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে প্রত্যেকে নিজের মাথা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান বাদল। গুরুতর আহত অবস্থায় বিনয়-দীনেশকে পাঠানো হয় হাসপাতালে।
পুলিশ কমিশনার টেগার্ট এতদিনের বিনয়কে হাতে পেয়ে অচেতন বিনয়ের হাতে বুট দিয়ে পিষে সবকয়টি আঙ্গুল ভেঙে দেন। মেডিকেলের ছাত্র বিনয় জানতেন মৃত্যুর পথ। ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ রাতে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতে বিনয় তার মাথার ব্যান্ডেজ খুলে আঙ্গুল দিয়ে নিজের মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করেন। ওদিকে ডাক্তারদের প্রচেষ্টায় দীনেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এর মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার অবৈধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ট্রাইব্যুনালের বিচারে দীনেশের ফাঁসির আদেশ হয়।
১৯৩১ সালের ৭ জুলাই ফাঁসির তারিখে সকালে তিনি স্নান করে ফাঁসির মঞ্চে অগ্রসর হন। সার্জেন্ট তাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমার কিছু বলার আছে বন্দী?
উত্তরে বিপ্লবী দীনেশ বলেন “চুপ থাকো আমাদের বলার অধিকার যে কেড়ে নিয়েছে সেকথা তোমরা ভালোই জানো। তোমার কাজ করো আমি প্রস্তুত।” পরমুহূর্তে ফাঁসিতে ঝুলে থমকে যায় তার নিঃশ্বাস। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই অন্যায়ভাবে ফাঁসির কাষ্ঠে শেষ হয় এই বিপ্লবীর জীবন।
দীনেশের ফাঁসির পরদিন কলকাতাসহ দেশজুড়ে চলে হরতাল। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কলকাতায় ডালহৌসি স্কয়ারের নাম বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে রাখা হয় বি.বা.দী বাগ। বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে বিক্রমপুরের এই তিন বিপ্লবী সন্তানকে।


