১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বুধবার | সকাল ১১:৪৪
বিক্রমপুরের চার পাশ ঘেরা নদ নদী গুলোর অবস্থান ও বর্ননা
খবরটি শেয়ার করুন:
293

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের নদীগুলো বিভিন্ন সময় তার গতিপথ পরিবর্তন করে দেশের ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন করেছে। একসময়ের বিশাল ব্রহ্মপুত্র আজ মরা নদীর সুতা, বুড়িগঙ্গা বুড়ি হয়ে জীর্ণ, গঙ্গা কীর্তিনাশ করে আজ কীর্তিনাশা পদ্মা। ১৫৫০ সালে প্রণীত জাও দ্য ব্যারোস, ১৬৬০ সালে প্রণীত ফন ডেন ব্রোক, ১৭৬৪-৭৬ সালে প্রণীত রেনেলের মানচিত্র অধ্যয়নে নদ-নদী পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। প্রাচীনকালের নদী ব্যবস্থা জানার জন্য এর চেয়ে আদি ও নির্ভুল কোনো মানচিত্র আমাদের হাতে নেই। পর্যটকদের বিবরণী, বিভিন্ন লিখিত উপাদান থেকে বিভিন্ন স্থানের নদ-নদীর বিষয়ে আংশিক ধারণা পাওয়া যায় মাত্র। নিবিড় ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাচীন নদী ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যেতে পারে। প্রাচীন মানচিত্র ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও পুরনো মানচিত্র, পর্যটকদের বিবরণী, লিখিত অন্যান্য উপাদান ও বর্তমান অবস্থান দেখে এটি স্পষ্টতই বোঝা যায়, বাংলাদেশের বিক্রমপুর অঞ্চলটি ছিল সভ্যতা বিকাশের অনুকূল স্থান। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদী বিক্রমপুরের কাছে এসে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ফলে কৃষি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বিক্রমপুর অঞ্চলটির অবস্থান এমন স্থানে, যেখান থেকে বাংলা তথা ভারতবর্ষ এমনকি পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে নৌপথে যোগাযোগ অনেক সহজ করে তোলে। নিচে বিক্রমপুর অঞ্চলের বর্তমান নদ-নদীগুলোর একটি বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

ধলেশ্বরী

বিক্রমপুরের উত্তরসীমায় ধলেশ্বরী নদী অবস্থিত. যা যমুনার একটি শাখা নদী। ময়মনসিংহ জেলার সলিমাবাদে যমুনার এ শাখাটি বের হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পরে পূর্ব দিকে, তার পর উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে মানিকগঞ্জ হয়ে পূর্ব দিকে সাভার অতিক্রম করে ফুলবাড়ীয়ার কাছে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মাঝে সিংহদ নামে একটি শাখা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে কলাগাছিয়ায় শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মেঘনা

বিক্রমপুরের পূর্বসীমায় অবস্থিত। কিশোরগঞ্জ জেলার পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ভৈরব বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কলাগাছিয়ায় শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদী একত্র হয়ে বিক্রমপুরের পূর্ব পাশ দিয়ে চাঁদপুরের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

পদ্মা বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার দক্ষিণসীমায় অবস্থিত। তবে প্রাচীন বিক্রমপুরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পদ্মা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। গঙ্গার যে শাখাটি রাজশাহী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সেটিই পদ্মা নামে অভিহিত। রাজশাহী থেকে ক্রমশ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে এসে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে পূর্ব দিকে প্রাচীন বিক্রমপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে; বর্তমান সময়ে বিক্রমপুরের যে অংশে পদ্মা মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অনেকের মতে, পদ্মা গতি পরিবর্তন করে বিক্রমপুরের পশ্চিম দিক পরিত্যাগ করে মরা পদ্মা নামে এক প্রবলাংশ বা প্রায় শত বছরের মধ্যে উদ্ভব হয়ে প্রাচীন কালীগঙ্গা নদীর বিলোপ সাধন করেছে। এটাই কীর্তিনাশা নামে পরিচিত। মেজর রেনেলের অঙ্কিত ১৭৮১ সালের মানচিত্রে দেখা যায়, পূর্বে পদ্মা নদী বিক্রমপুরের অনেকটা পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভুবনেশ্বরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। সে সময় কীর্তিনাশা বা নয়া ভাঙ্গনী নামে কোনো নদী ছিল না। বিক্রমপুরের রাজনগর ও ভাদ্রেশ গ্রামের মধ্যে একটি অপ্রশস্ত জলপ্রণালি বিদ্যমান ছিল মাত্র। ১৮১৮ সালে এ পদ্মার প্রধান স্রোত রেনেলের কালীগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হতো। এ পরিবর্তন ক্রমে ক্রমে ঘটেছিল। এমনকি ১৮৪০ সাল পর্যন্ত পদ্মা দক্ষিণ বিক্রমপুরের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো। এ নদী তখনো পদ্মা নামে এবং নতুন নদীটি কীর্তিনাশা নামে পরিচিত ছিল।

১৭৬৪ সালে মেজর রেনেল ঢাকার উত্তর অংশেই ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার সম্মিলন দর্শন করেছিলেন। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থ পাঠে জানা যায়, ১৬ শতকে এটিই ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত ছিল। এ স্রোত ঢাকার পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জাফরগঞ্জের কাছে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। এ সম্মিলিত প্রবাহ রেনেলের উল্লিখিত নালা ও ফরিদপুরের অন্তর্গত পাঁচ্চরের মধ্যস্থিত পদ্মার প্রাচীন খাত পরিত্যাগ করে ইতিহাস প্রসিদ্ধ রাজবাড়ী মঠের কিঞ্চিত্ দক্ষিণে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। ১৭৮৭ সালের বন্যার ফলেই যে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার প্রাচীন প্রবাহের পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রাচীন প্রবাহ এখন ময়নাকাঁটা ও আড়িয়াল খাঁ নামে পরিচিত। পদ্মার গতি পরিবর্তন অতি বিচিত্র।

খাল-বিল

অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও আন্তঃনদী যোগাযোগে, সেচ ব্যবস্থা ও গৃহস্থালি কাজে পানি ব্যবহারের জন্য খালের ভূমিকা নদীর প্রায় সমগুরুত্বপূর্ণ। নদী থেকে দূরে অবস্থিত বসতিতে খালগুলো নদীর মতোই ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। বিক্রমপুরের খালের মধ্যে তালতলার খাল বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিল। এ খাল বহরের কাছ থেকে উত্পন্ন হয়ে বালিগাঁও, মিলিমপুর, কোরাল, বাকাইচাল, ফেগুনাসার, মালখানগর ও তালতলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধলেশ্বরীতে গিয়ে মিশেছে। এ বিখ্যাত খালই ধলেশ্বরী থেকে পদ্মার যাতায়াতের পথ সহজ করে তুলেছে।

মীর কাদিমের খাল রিকাবীবাজারের কাছে ধলেশ্বরী নদী থেকে উত্পন্ন হয়ে মোকামখোলায় মাকুহাটীর খালের সঙ্গে মিশেছে। হলদিয়া, তালতলা, মীর কাদিম— এ তিনটি প্রসিদ্ধ খাল থেকে বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাল খনন করে বিক্রমপুরের অভ্যন্তরস্থ গ্রামগুলোকে হাট-বন্দরে চলাচল ও বাণিজ্য পণ্য বহনের সুবিধা করে দিয়েছে। এছাড়া বিক্রমপুর অঞ্চলে অন্যান্য খালের মধ্যে রয়েছে ভোজেশ্বর খাল, ঘরিসার খাল, নড়িয়ার খাল, মহিষখোলার খাল, নওপাড়ার খাল, গোয়ালমারীর খাল, গোয়ালার খাল, পিঞ্জিরির খাল, ফতেপুর খাল, চিকন্দির খাল, পালঙ্গের খাল, বিলরুট খাল ইত্যাদি।

বিক্রমপুরের বিলের মধ্যে আড়িয়াল বিল বিশেষ প্রসিদ্ধ। এছাড়া অন্যান্য বিলের মধ্যে রয়েছে কদম বিল, জিয়াস বিল, হাসাড়াল বিল ইত্যাদি।

বিক্রমপুর অঞ্চল গাঙ্গেয় উপত্যকার পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরী-ইছামতী বিধৌত নিম্নাঞ্চল বিক্রমপুর প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় উপমহাদেশের একটি পীঠস্থান হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। প্রাচীন বিক্রমপুর বৃহত্তর ঢাকা ও ফরিদপুর জেলার বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে গঠিত থাকলেও বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্গত পাঁচটি উপজেলাই কেবল ‘বিক্রমপুর’ পরিচয় বহন করে।

বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তাম্র-শিলালিপি, পাথর, ধাতব ও কাঠের বৌদ্ধ ও হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি ও ভাস্কর্য আবষ্কার হয়েছে, যা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বরেন্দ্র জাদুঘর, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও পৃথিবীর অনেক জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রাক-মধ্যযুগের চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজবংশ এবং মধ্যযুগে সুলতানি আমল, বারো ভূঞাদের সময়কাল এবং মোগল আমলের প্রত্ন নিদর্শন সাক্ষ্য দেয় যে, এখানে সমৃদ্ধ এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ায় আমাদের কাছে দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুলতানি আমলে বাবা আদম শহীদের মসজিদ, মোগল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ, মীর কাদিমের পুল ও ব্রিটিশ আমলের দৃষ্টিনন্দন বেশকিছু মন্দির এবং নগর কসবার প্রাসাদগুলো এখনো দর্শকদের মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। সুষ্ঠু প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অভাবে এখানকার সঠিক সাংস্কৃতিক অনুক্রম সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি এখনো।

বিক্রমপুর, রামপাল, বজ্রযোগিনী, বল্লালবাড়ীসহ বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী স্থানের নাম থেকে বিক্রমপুরের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুর পাশাপাশি প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চল নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন উপকথা। এ ধরনের গল্প-উপকথার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্যিক সূত্র থেকে বিশেষজ্ঞরা গুপ্ত যুগ পর্ব থেকে বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ মানববসতির দিকে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। হিউয়েন সাং ও ইত্ সিংয়ের বর্ণনা থেকে অনেকে বিক্রমপুরের সঙ্গে সমতট অঞ্চলের সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন। পাল সময় পর্বেও বিক্রমপুর সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল ছিল, এ ধরনের একটি মত প্রচলিত আছে। কথিত আছে, অতীশ দীপঙ্করের সময় (৯৮২-১০৫৪) বিক্রমপুরের বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে নেপাল, তিব্বত, চীন, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী ও ১০০ জন শিক্ষক ছিলেন। বলা হয়, অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন ওই শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ। পরবর্তী সময়ে তিনি তিব্বতের আমন্ত্রণে সেখানে গমন করেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় বজ্রযান রীতি (মহাযানের একটি পথ) প্রচারের জন্য অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধ সমাজে খুবই সমাদৃত। তিব্বতে গৌতম বুদ্ধর পর অতীশ দীপঙ্করকে স্থান দেয়া হয়।

প্রাচীন বঙ্গ এবং সমতট জনপদের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান হিসেবে বিক্রমপুরের অবস্থান। গুপ্ত ও পাল সময় পর্বে বিক্রমপুরে মানববসতি সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ সম্বন্ধে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া না গেলেও চন্দ্র (৯০০-১০৫০), বর্মণ (১০৮০-১১৫০) ও সেন (১০৯৫-১১৬০) রাজবংশের এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের সুস্পষ্ট লিপি প্রমাণ ও ভাস্কর্য প্রমাণ রয়েছে। সুলতানি (১২০৪/০৬-১৫৩৭), মোগল (১৫৩৭-১৭৫৭) ও ব্রিটিশ সময় পর্বের নিদর্শন এ অঞ্চলের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীনকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বর্তমান সময় পর্যন্ত এখানে সমৃদ্ধ মানববসতির উপস্থিতি বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জেমস টেইলরের বর্ণনা ও মেজর জেমস রেনেলের মানচিত্রে (১৭৮১) বিক্রমপুর সম্বন্ধে তথ্য পাওয়া যায়। বিক্রমপুরের ইতিহাস বিষয়ে আলোকপাত করেছেন অম্বিকাচরণ ঘোষ, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রমুখ। ১৯১২-১৩ সালে পরেশ নাথ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও ১৯১৬-১৭ সালে ঢাকা জাদুঘরের পক্ষ থেকে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী এ অঞ্চলে সীমিত উত্খনন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদনে বিক্রমপুর সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তবে এখন পর্যন্ত বিক্রমপুর অঞ্চলে সুষ্ঠু ও পদ্ধতিগত পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সম্পন্ন না হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস এখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।

আমরা যখনই বিক্রমপুরের কথা শুনি, তখনই মনে হয় এটি ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী। কিন্তু যখন কেউ বিক্রমপুরে আসে, তখন দেখে সুলতানি আমলের মসজিদ, মাজার, মোগল আমলের দুর্গ, পুল, ব্রিটিশ আমলের বাড়িঘর, অফিস, মন্দির ইত্যাদি। সুলতানি, মোগল বা ব্রিটিশ কোনো আমলেই বিক্রমপুর বাংলার রাজধানী ছিল না। কিন্তু সে নিদর্শন দৃশ্যমান! তাহলে রাজধানী বিক্রমপুরের সব নিদর্শনই কি কীর্তিনাশা বিলীন করে দিয়েছে? কেউ কি পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করেছেন? কীর্তিনাশার নিম্নাঞ্চলে এর ধ্বংসাবশেষের কোনো চিহ্ন কি পাওয়া গেছে? এসব প্রশ্ন সামনে রেখে এর উত্তর খুঁজতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় প্রত্নতত্ত্বপ্রেমী, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, কবি ও সাহিত্যিক ড. নূহ উল আলম লেনিন কর্তৃক পরিচালিত ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষক দল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, ভূতত্ত্ব অধিদফতর ও অন্যান্য গবেষকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা শুরু হয়েছে বিক্রমপুর অঞ্চলে। এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকালের প্রবাহে মাটিচাপা পড়ে থাকা বিক্রমপুরের অতীত ইতিহাস তথা বাংলাদেশের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আরো করবে বলে বিশ্বাস করি। ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষক দল ২০১০-১১ অর্থবছরে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় নয়টি প্রত্নস্থানে পরীক্ষামূলক উত্খনন করে। প্রত্যেকটি প্রত্নস্থানে প্রাচীন বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে ৯ নং প্রত্নস্থানে এসে প্রথম প্রাচীন স্থাপত্যের একটি দেয়ালের অংশবিশেষ আবিষ্কার করা হয়। এ স্থাপত্যটিই হলো রাজধানী বিক্রমপুরে প্রাপ্ত প্রথম স্থাপত্যিক নিদর্শন, যা প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর উন্মোচনের নির্দেশনা দেয়। ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুরে (বজ্রযোগিনী গ্রাম-সংলগ্ন) উত্খননের ফলে একটি বিহারের দক্ষিণ-পূর্বাংশ উন্মোচিত হয়, যেখানে ছয়টি ভিক্ষু কক্ষ, একটি মন্দির ও পাঁচটি স্তূপসহ একটি স্তূপ হলঘর আবিষ্কার হয়। আপাতদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে, এটি একটি বড় বৌদ্ধ বিহারের দক্ষিণ-পূর্বাংশ। ব্যাপকভিত্তিক উত্খননের মাধ্যমে হয়তো আবিষ্কার হতে পারে বাংলা তথা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিহার। বিক্রমপুর অঞ্চলে এক হাজার বছর আগের একটি বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কার বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত স্মরণীয় ঘটনা। এ অমূল্য আবিষ্কার বিক্রমপুরকে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের ইতিহাসে নতুন করে জায়গা করে দেবে। কারণ বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীর কীর্তিমান সন্তান ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮০-১০৫৪)। তিনি বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার নালন্দায় অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ। বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয় রোধে রাজা চং ছপের বিশেষ আমন্ত্রণে অতীশ চীনে গমন করেন। সেখানে ১৬ বছর অবস্থানকালে তিনি ১৭৫টি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতিরা তাকে সম্মানসূচক হো-বো-জে অর্থাত্ দ্বিতীয় বুদ্ধ, ভারতবর্ষ ধর্মপাল ও গোটা বিশ্বের বৌদ্ধ সম্প্রদায় মিলে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ উপাধি প্রদান করেছিল। অতীশ দীপঙ্করের বাল্যনাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। কৈশোর অতিক্রমমাত্রই যিনি একদা বৌদ্ধ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভান্তের স্থান অধিকার করেছিলেন, তিনি বর্তমানে নিজ গ্রামে উপেক্ষিত, শেকড় ছিন্ন। চীন সরকার সম্প্রতি বজ্রযোগিনী গ্রামে তার স্মরণে একটি স্মারক স্থাপন করে। চীনা ও ইংরেজি ভাষায় সেখানে লেখা রয়েছে, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এক হাজার বছর আগে চীনে শুধু বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কার করেননি; তিনি চীনে প্রচলন করেছিলেন বাংলার সেচ ও কৃষি ব্যবস্থা এবং ওষুধ প্রযুক্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে গৌতম বুদ্ধের পরই অতীশ দীপঙ্করের স্থান।

আমাদের ধারণা, আবিষ্কৃত বৌদ্ধ বিহারের সঙ্গে অতীশ দীপঙ্করের একটি গভীর সম্পর্ক ছিল। গবেষণা চলমান থাকলে এ সম্পর্কে আরো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আবিষ্কার হবে, যার ইঙ্গিত এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মগধের পূর্বে বাংলায় ‘বিক্রমপুরী’ নামে একটি বৌদ্ধ বিহার ছিল।

২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রঘুরামপুরের পাশাপাশি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামে মীর কাদিম খালের পূর্ব তীরে নাটেশ্বর প্রত্নস্থানে কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হয় চীনের সাংস্কৃতিক স্মারক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ইউনান প্রাদেশিক ইনস্টিটিউট। প্রায় দুই মাস পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননে নাটেশ্বর দেউলে আবিষ্কার হয় চেম্বারসহ অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ ও মণ্ডপ, সদ্য আবিষ্কৃত প্রায় চার মিটার প্রশস্ত সীমানাপ্রাচীরবিশিষ্ট দুই জোড়া চতুঃস্তূপ; বাংলাদেশে স্তূপের ইতিহাসে যা একটি অভিনব সংযোজন। আর্দ্রতা রোধক হিসেবে ভিত্তি দেয়ালে ঝামা ইটের ব্যবহার, চারটি স্তূপের স্থানিক পরিমিতি, বর্গাকৃতি ভারসাম্য, দেয়ালের অপ্রচলিত নজিরবিহীন কাঠামো (নিচের তুলনায় ওপরে অধিক প্রশস্ত) প্রভৃতি বাংলাদেশের প্রাচীন উন্নত স্থাপত্য ইতিহাসের একটি নতুন সংযোজন। প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন ইট নির্মিত দুটি পাকা রাস্তার আবিষ্কার তত্কালীন সড়ক নির্মাণ কৌশল, বসতি পরিকল্পনা ও বিন্যাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেউলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আবিষ্কার হয়েছে ইট নির্মিত ২ দশমিক ৭৫ মিটার প্রশস্ত আঁকাবাঁকা একটি বিশেষ দেয়াল; এ মুহূর্তে যা একটি বিস্ময়কর স্থাপত্যের আভাস দিচ্ছে। নাটেশ্বরের প্রত্নস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে প্রায় সাত মিটার গভীরতায় প্রাপ্ত পাঁচটি নির্মাণযুগের প্রত্ন নিদর্শন, যা বিক্রমপুর অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী এক সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। ধারাবাহিক গবেষণা ও সম্ভাবনাপূর্ণ আবিষ্কার এ নির্মাণ যুগগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করবে।

উত্খননকৃত প্রত্নস্থানগুলো ছাড়াও বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রচুর প্রত্নস্থান রয়েছে, বিশেষত মুন্সীগঞ্জ সদর ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বেশির ভাগ স্থানেই প্রাচীন ইট লক্ষ করা যায়, যা এ অঞ্চলে বিস্তৃত সভ্যতার ইঙ্গিত প্রদান করে। বৃহত্ স্কেলে উত্খনন পরিচালিত হলে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বিভিন্ন দিক বের হয়ে আসবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,

উপপরিচালক, ঐতিহ্য-অন্বেষণ