বিক্রমপুরের আভিজাত্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি আজমেরী জামান রেশমা
২১১৭

মুন্সিগঞ্জ, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

বাংলার টেলিভিশন নাটক, মঞ্চ, বেতার ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই তালিকার অন্যতম উজ্জ্বল নাম আজমেরী জামান রেশমা।

ষাট ও সত্তরের দশকের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর উপস্থিতি ছিল একাধারে সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও শিল্পমেধার অনন্য সংমিশ্রণ। অভিনয়, উপস্থাপনা ও শিল্পনির্দেশনা—সবখানেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ছাপ।

তবে শিল্পী পরিচয়ের বাইরেও আজমেরী জামান রেশমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী ও শিক্ষিত পরিবারের একজন কৃতি উত্তরসূরি।

মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা কাজী আমির হোসেন ছিলেন মুন্সিগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। শিক্ষাবান্ধব ও সংস্কৃতিমনা পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন তিনি।

পরিবারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ছিল সমৃদ্ধ। তাঁর ছোট বোন নাজমা আনোয়ার এবং ভাগনি ইশরাত নিশাত দেশের নাট্যাঙ্গনে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। ফলে বলা যায়, শিল্প ও সংস্কৃতি যেন ছিল তাঁদের পারিবারিক উত্তরাধিকার।

১৯৬০ সালে বেতার ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ভয়েস অব আমেরিকা’-তে ভয়েস আর্টিস্ট, সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আজমেরী জামান রেশমা। তাঁর উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর ও উপস্থাপনার দক্ষতা দ্রুতই তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। সে সময় ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে বিশেষভাবে। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা টেলিভিশনের উদ্বোধনী দিনে মুনীর চৌধুরী রচিত ‘একতলা দোতলা’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

সত্তরের দশকে টেলিভিশন নাটকে তাঁর অভিনয় তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে। বিশেষ করে উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের নাটকের বাংলা রূপান্তর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এ তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে।

নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।

সেই সময়ের দর্শকদের কাছে নাটকটি যেমন জনপ্রিয় ছিল, তেমনি আজও নাট্যপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে তাঁর চরিত্রটি।

এ ছাড়া ‘শেষের কবিতা’, ‘বৃত্ত থেকে বৃত্তে’, ‘সাঁকো পেরিয়ে’, ‘দিন বদলের পালা’ ও ‘গোর খোদক’-এর মতো অসংখ্য নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযত অভিব্যক্তি, স্পষ্ট সংলাপ উচ্চারণ এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি।

চলচ্চিত্রেও ছিল তাঁর সফল পদচারণা। ‘জি না ভি মুশকিল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরে অভিনয় করেন ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘নয়ন তারা’, ‘ইন্ধন’, ‘চাঁদ আর চাঁদনি’, ‘সূর্য ওঠার আগে’, ‘শেষ উত্তর’, ‘চকোরী’ ও ‘দরশন’-এর মতো জনপ্রিয় বাংলা ও উর্দু ছবিতে। সে সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী নাদিম ও শাবানা–র সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চে শিল্প নির্দেশক হিসেবেও তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশংসিত। ষাটের দশকে তিনি যুক্ত ছিলেন ড্রামা সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাট্য সংগঠনের সঙ্গে।

নাট্যাঙ্গনের অনেকেই মনে করেন, তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও শিল্পবোধ ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও পরিশীলিত।

অভিনেতা আবুল হায়াত এক স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, “আমরা যখন টেলিভিশনে কাজ শুরু করিনি, তখন হাসান ইমাম ভাই, গোলাম মোস্তফা ভাইদের সঙ্গে তাঁকে অভিনয় করতে দেখেছি। একটা সময় তাঁর ভক্ত ছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “পরিচালক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত কমান্ডেবল ছিলেন।”

ব্যক্তিজীবনে আজমেরী জামান রেশমা ছিলেন পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রথম দিককার প্রযোজক জামান আলী খান–এর সহধর্মিণী।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে আজমেরী জামান রেশমা এক অনন্য অধ্যায়। তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিক্রমপুরের মার্জিত রুচি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।

তাঁর অভিনয়, কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্ব এখনও বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি সময়ের স্মারক হয়ে আছে।

দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ২০২০ সালের ২০ মে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই গুণী শিল্পী। নীরব জীবনযাপনের মতোই নিভৃতেই শেষ হয় বিক্রমপুরের এই সাংস্কৃতিক নক্ষত্রের বর্ণাঢ্য পথচলা।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ