১০ লাখ টাকা এফডিআর ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রদানের নিশ্চয়তায় সেই শিশুকে পেল ১১ বছর ধরে নিঃসন্তান রবিউল-সুমাইয়া
1

মুন্সিগঞ্জ, ১০ জুলাই ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাস্টবিন-সংলগ্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া সেই কন্যা নবজাতকের বৈধ অভিভাবকত্ব পেয়েছেন ১১ বছর ধরে নিঃসন্তান দম্পতি রবিউল ইসলাম ও সুমাইয়া আক্তার।

শিশুটির ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার নামে ১০ লাখ টাকার এফডিআর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রবিউল। পাশাপাশি আইনগতভাবে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ জুন গভীর রাতে গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাস্টবিন-সংলগ্ন স্থান থেকে জীবিত অবস্থায় এক কন্যা নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এরপর নবজাতকের চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করে।

গত ৬ জুলাই জেলা প্রশাসক, মুন্সিগঞ্জ সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর সভাপতিত্বে জেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভায় নবজাতকের বৈধ অভিভাবকত্ব প্রদান বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ৯ জুলাই বোর্ডের সদস্যরা তাদের মতামত ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সার্বিক কল্যাণ বিবেচনা করে এবং প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের লক্ষীপুর উত্তরপাড়ার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম ও সুমাইয়া আক্তার দম্পতির কাছে নবজাতকের বৈধ অভিভাবকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সামাজিক তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ১১ বছর আগে বিয়ে হলেও রবিউল-সুমাইয়া দম্পতির কোলজুড়ে কোনো সন্তান আসেনি। সন্তান লাভের আশায় তারা প্রায় পাঁচ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিশেষায়িত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। এ সময় সুমাইয়ার অস্ত্রোপচারসহ Intrauterine Artificial Insemination (IAI) পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হয়। তবে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

তদন্তে আরও জানা যায়, রবিউল পেশায় একজন রংয়ের ঠিকাদার। তার বার্ষিক আনুমানিক আয় প্রায় ৬ লাখ টাকা। তার বাবার একটি মুদি দোকান রয়েছে, যা পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের উৎস। অন্যদিকে সুমাইয়ার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত আনসার সদস্য। ভবেরচর হাসপাতালের সামনে তাদের পরিবারের চারটি দোকান রয়েছে, যেখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৭ হাজার টাকা ভাড়া আসে। এছাড়া রবিউলের দুই ভাইও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সব মিলিয়ে উভয় পরিবারের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

রবিউল, সুমাইয়া এবং উভয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে তদন্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন যে, সবাই শিশুটিকে পরিবারের সদস্য হিসেবে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে আগ্রহী এবং তার লালন-পালন ও পরিচর্যায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।

তদন্তকালে রবিউল জানান, শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তিনি তার নামে ১০ লাখ টাকার এফডিআর করবেন। এছাড়া বৈধ অভিভাবকত্ব পাওয়ার পর শিশুটিকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্পত্তির আইনসম্মত অংশ প্রদান করবেন। একই সঙ্গে শিশুটির বর্তমান চিকিৎসা, ভবিষ্যতের চিকিৎসা, শিক্ষা এবং ভরণ-পোষণের যাবতীয় ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নবজাতকটি উদ্ধারের পর থেকেই রবিউল-সুমাইয়া দম্পতি শিশুটির পাশে রয়েছেন। তারা নিজেদের সন্তানের মতো করে তার পরিচর্যা করছেন। বিশেষ করে সুমাইয়া শিশুটি উদ্ধারের দিন থেকে একটানা হাসপাতালেই অবস্থান করছেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি একবারের জন্যও নিজ বাড়িতে যাননি। শিশুটির সেবাযত্নে তার এই নিরলস উপস্থিতি ও মমত্ববোধ তদন্ত প্রতিবেদনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

জানা যায়, শিশুটি মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি ইউনিটের অধীনে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে অবস্থা উন্নতির পথে। হাসপাতাল থেকে অবমুক্ত হতে ৪-৫ দিন সময় লাগবে।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ