শিহাব আহমেদের লেখা: নির্বাচনে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা-‘অনুমতির শৃঙ্খল’ ভাঙতে হবে
মুন্সিগঞ্জ, ৪ অক্টোবর ২০২৫, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ২৩ জুলাই ‘নির্বাচনি সংবাদ সংগ্রহে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিক/গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য নীতিমালা ২০২৫’ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে প্রথমেই বলা হয়েছে—
“সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সাংবাদিকগণ যাতে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার পরিষদের সকল সাধারণ ও উপনির্বাচনে নির্বিঘ্নে নির্বাচনি এলাকা ও ভোটকেন্দ্র হতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করতে পারেন সেজন্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকে।”
বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে সুন্দর ও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন। গত দশ বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা করার সময় জাতীয় নির্বাচনসহ সরকার কর্তৃক আয়োজিত অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে আমি তৎকালীন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাংবাদিকতার জন্য সহায়ক মনে করিনি।
বর্তমান পরিবর্তনকামী সরকার এই পরিবেশের উন্নতি বিধান করবে বলে স্বাভাবিকভাবেই মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত বহাল আছে, তাতে আমার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না বলে মন খারাপ হচ্ছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধক এমন কোনো নীতিমালা বা বিধি নির্বাচনের সময় বহাল থাকছে—এটি কোন স্বার্থে, সেই প্রশ্ন আজ আবারও তুলতে হচ্ছে। আমার সাহস, উৎসাহ বা মনের শক্তি আগামী নির্বাচনে ‘সাংবাদিকবান্ধব’ পরিবেশ দেখতে পাচ্ছে না। সেটি কেন, সেই আলোচনা করছি।
ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও অনুমতির অসঙ্গতি
নির্বাচনি সংবাদ সংগ্রহে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবাদিক/গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে ১০ নং ধারায় বলা হয়েছে—
“নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পর প্রিজাইডিং অফিসারকে অবহিত করে ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে কোনক্রমেই গোপন কক্ষের ভিতরের ছবি ধারণ করতে পারবেন না।”
প্রথমেই বলা হয়েছে সাংবাদিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, কিন্তু পরের অংশে বলা হচ্ছে—প্রিজাইডিং অফিসারকে অবহিত করে তবেই কাজ করতে পারবেন। এখানেই আপত্তির জায়গা। একজন সাংবাদিক ভোটকেন্দ্রে ঢুকে যদি অনিয়মের দৃশ্য দেখেন, তাহলে তিনি কি সেই মুহূর্তে প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতির অপেক্ষা করবেন? আবার সেই অনুমতি চাইতে হবে যিনি নিজেই অনিয়মে যুক্ত থাকতে পারেন—তাহলে এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা কোথায়?
এখানেই নির্বাচন কেন্দ্রে অনুমতি প্রসঙ্গটি স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এবং এর বিরোধিতা করাই যৌক্তিক।
সাংবাদিকদের ঝুঁকি ও আইনি জটিলতা
নীতিমালার ১১ নং ধারায় বলা হয়েছে—
“উপরোল্লিখিত নির্দেশনা কোন সাংবাদিক পালন না করলে কার্ড ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ তার সাংবাদিক পাশ বাতিল করতে পারবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অর্থাৎ, যদি সাংবাদিক অনুমতি না নেন, তবে তাঁর কার্ড বাতিল হতে পারে, এমনকি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া যেতে পারে। এতে সাংবাদিকরা প্রিজাইডিং অফিসারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। স্বাধীন গণমাধ্যম ব্যবস্থার জন্য এটি মারাত্মক সংকেত।
গণভোট আইন, ১৯৯১-এর ৬ (২) ধারায় প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব হিসেবে বলা আছে—তিনি ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন এবং প্রয়োজন মনে করলে রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করবেন। কিন্তু সাংবাদিকদের কাজের অনুমতি বা নিয়ন্ত্রণ তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তা সত্ত্বেও বর্তমান নীতিমালায় তাঁকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে—যা আইনি দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত ভূমিকা
পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে—প্রিজাইডিং অফিসার নয়, বরং ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেন। অনেক সময় তাঁরা নিজেরাই যেন প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ নীতিমালার ৮ নং ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—“সাংবাদিকদের বিষয়ে নির্দেশনাসমূহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিতে হবে।”
বাস্তবে তা মানা হয় না। ফলে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নির্ভর করে নিরাপত্তা কর্মীর সদিচ্ছার ওপর। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা হুমকির মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা
বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাংবাদিকদের নির্বাচনি কাভারেজে অনুমতিহীন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। যেমন- ভারতে নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অনুমোদনপত্র দেয়, স্থানীয় অনুমতি নিতে হয় না। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সাংবাদিকরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে স্বাধীনভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারেন, যতক্ষণ ভোটের গোপনতা লঙ্ঘিত না হয়।
OSCE ও UNESCO-র গাইডলাইনে বলা আছে, “Journalists must have unimpeded access to polling stations and counting centers without any prior approval.” বাংলাদেশের নীতিমালায় এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্য স্পষ্ট।
সংস্কারের প্রস্তাব ও বিকল্প পথ
নির্বাচন কমিশন চাইলে নীতিমালাটি সংস্কার করে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা—দুই-ই নিশ্চিত করতে পারে। যেমন- ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য সাংবাদিকদের একক অনুমোদনপত্র যথেষ্ট হবে; প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি প্রয়োজন হবে না। প্রতিটি জেলায় Election Media Facilitation Cell গঠন করা হোক, যাতে সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান পান। সাংবাদিক ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির জন্য নির্বাচন-পূর্ব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। সাংবাদিকদের কাজে বাধা দিলে বা অনুমতি অযৌক্তিকভাবে অস্বীকার করলে প্রিজাইডিং অফিসারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সংবাদ বাস্তবতায় মোবাইল সাংবাদিকতা, লাইভ কাভারেজ—এসবের জন্য স্পষ্ট গাইডলাইন যুক্ত করতে হবে, যা বাস্তবসম্মত।
দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
নীতিমালায় বলা হয়নি, যদি প্রিজাইডিং অফিসার সাংবাদিককে অনুমতি না দেন বা বাধা দেন, তাঁর জবাবদিহিতা কোথায় হবে?
এটি একতরফা নিয়ম—সাংবাদিকের ওপর দায়িত্ব, কিন্তু কর্মকর্তার ওপর নেই কোনো দায়। এভাবে নীতি নির্ধারণ সাংবাদিকদের উপরেই কেবল নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যা ন্যায়সংগত নয়।
প্রযুক্তির যুগে অনুমতির ধারা অযৌক্তিক
আজকের ডিজিটাল সংবাদযুগে প্রতিটি রিপোর্টার, এমনকি নাগরিক সাংবাদিকও হাতে মোবাইল নিয়ে মাঠে কাজ করেন। এমন বাস্তবতায় ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পর অনুমতির জন্য অপেক্ষা করার নিয়ম কার্যত অকার্যকর ও অযৌক্তিক। সংবাদ তখনই সংবাদ, যখন তা সময়মতো প্রকাশিত হয়; অনুমতির জন্য দেরি মানেই সত্য গোপন হয়ে যাওয়া।
সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র ও জনগণের জানার অধিকার
স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। নির্বাচনকালীন সময়ে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ না থাকলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জনগণের জানার অধিকার—সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নীতিমালার ১০ নং ধারাটি এই মৌলিক অধিকারকে সীমাবদ্ধ করছে। এটি শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা নয়, গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করছে।
পরিশেষে বলতে চাই, নির্বাচন শুধু ভোটের উৎসব নয়—এটি জনগণের বিশ্বাসের পরিমাপক। সেই বিশ্বাস রক্ষা করে গণমাধ্যম। তাই সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচনও অবাধ বা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত এই নীতিমালার ১০ নং ধারাটি সংশোধন বা বাতিল করা, যাতে সাংবাদিকদের অনুমতিহীনভাবে ভোটকেন্দ্রে তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা পুনর্বহাল হয়।
একইসঙ্গে সুযোগসন্ধানী অপসাংবাদিকদের কারণে ভোটের পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কর্মরত নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাংবাদিকরা বাধাহীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারেন। আসন্ন নির্বাচনে সেই স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে পারলেই নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে ‘সাংবাদিকবান্ধব নির্বাচন’-এর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে।
লেখক: শিহাব আহমেদ, সাংবাদিক








