মুন্সিগঞ্জের সন্তান আব্দুল কাদের, ‘বদি’, আর ‘ইত্যাদি’র মামা চরিত্রে এখনো জনপ্রিয় দর্শক হৃদয়ে
১৩৫

মুন্সিগঞ্জ, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)

জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি চরিত্রটির কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? হুমায়ূন আহমেদের লেখা এই নাটকে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন অভিনেতা আব্দুল কাদের। পর্দায় তাঁর মুখ, অভিনয় আর স্বতন্ত্র উপস্থিতি তাঁকে এনে দিয়েছিল বিশেষ পরিচিতি। একটা সময় নিজের নামের চেয়েও ‘বদি’ নামেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

কিন্তু অনেকের কাছে পরিচিত এই অভিনেতার শিকড় যে মুন্সিগঞ্জে, তা হয়তো সবার জানা নেই। মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্ম নেওয়া আব্দুল কাদের শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না, ছিলেন মঞ্চনাটকের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, শিক্ষক ও সফল পেশাজীবী। অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন দেশের অসংখ্য দর্শকের মন। তাঁর প্রয়াণের পরও অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন মানুষের স্মৃতিতে।

মুন্সিগঞ্জের সোনারংয়ে জন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা

১৯৫১ সালের ১ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল কাদের। তাঁর বাবা আব্দুল জলিল এবং মা আনোয়ারা খাতুন। স্ত্রী খাইরুন্নেছা কাদেরের সঙ্গে তাঁর সংসারে ছিল এক ছেলে ও এক মেয়ে।

সোনারং হাইস্কুল ও বন্দর হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

মুন্সিগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে এসে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও প্রতিভা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন আব্দুল কাদের। তাঁর এই পথচলা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্যও গর্বের।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই নাটকের সঙ্গে পথচলা

অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে নাট্যচর্চায় যুক্ত হন আব্দুল কাদের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা হয়।

১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মহসিন হল ছাত্র সংসদের নাট্যসম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। পরপর তিন বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ডাকসু নাট্যচক্রের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।

১৯৭৩ সালে যোগ দেন থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীতে। সেখানে চার বছর যুগ্ম সম্পাদক এবং ছয় বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকায় আমেরিকান কলেজ থিয়েটার ট্রুপ আয়োজিত অভিনয় কর্মশালায় প্রশিক্ষণ নেন।

শুধু অভিনয় নয়, নাট্যসংগঠক হিসেবেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন নাট্যশিল্পী ও নাট্যকারদের সংগঠন টেনাশিনাসের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি, যে চরিত্রে পেয়েছিলেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা

আব্দুল কাদেরের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটক। ১৯৯৪ সালে প্রচারিত এই নাটকে বদি চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।

নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রের মতো বদিও দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়। আর সেই চরিত্রের অভিনেতা আব্দুল কাদের হয়ে ওঠেন ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ। তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও সাবলীল উপস্থাপনা চরিত্রটিকে দর্শকের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল।

তবে ‘বদি’ই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে মামা চরিত্রে অভিনয় করেও দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। হাস্যরসাত্মক অভিনয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা ছিল তাঁর।

তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘মাটির কোলে’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘শীর্ষবিন্দু’, ‘সবুজ সাথী’, ‘তিন টেক্কা’, ‘যুবরাজ’, ‘আগুন লাগা সন্ধ্যা’, ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘আমার দেশের লাগি’, ‘প্যাকেজ সংবাদ’, ‘সবুজ ছায়া’, ‘কার ছায়া ছিল’, ‘দীঘল গায়ের কন্যা’, ‘কুসুম কুসুম ভালোবাসা’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’ ও ‘আমাদের ছোট নদী’। অভিনয়ের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন তিনি।

অভিনয়ের পাশাপাশি ছিলেন শিক্ষক ও করপোরেট পেশাজীবী

অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেলেও আব্দুল কাদেরের পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা করেন। সিংগাইর ডিগ্রি কলেজ এবং মুন্সিগঞ্জের লৌহজং কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৯ সাল থেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাটায় কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানটিতে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন।

একদিকে নাটক ও অভিনয়, অন্যদিকে শিক্ষকতা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন—সবকিছু সামলে নিজের কর্মজীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনের এই দিকটি প্রমাণ করে, অভিনয় ছিল তাঁর প্রতিভার একটি বড় পরিচয়; কিন্তু পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন আরও অনেক কিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একজন মানুষ।

পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা

অভিনয়ে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আব্দুল কাদের বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে টেনাশিনাস পুরস্কার, মহানগরী সংস্কৃত গোষ্ঠী পুরস্কার, জাদুকর পি. সি. সরকার পুরস্কার এবং টেলিভিশন শ্রোতা ফোরাম পুরস্কার।

তবে তাঁর অর্জনের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল দর্শকের ভালোবাসা। কোনো একটি চরিত্রে অভিনয় করে মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। আব্দুল কাদের সেই কঠিন কাজটিই করতে পেরেছিলেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও টেলিভিশন নাটকের দর্শকদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৬৯ বছর বয়সে প্রয়াণ

২০২০ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুল কাদের। ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর, শনিবার সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। পরে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। হারিয়ে যায় পরিচিত এক মুখ, যাঁর অভিনয়ে হাসি-আনন্দে মেতে উঠেছেন অসংখ্য দর্শক।

মুন্সিগঞ্জের গর্ব, দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন

মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ীর সোনারং গ্রামে জন্ম নেওয়া আব্দুল কাদের নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিনোদনজগতে। জন্মভূমি থেকে শুরু হওয়া তাঁর জীবনের পথচলা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে।

আজ তিনি নেই। কিন্তু ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি কিংবা ‘ইত্যাদি’র মামা চরিত্রে তাঁকে আবারও ফিরে পান দর্শকেরা। তাঁর অভিনয় যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো বেঁচে থাকতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মুন্সিগঞ্জের সন্তান আব্দুল কাদের তাই শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসের পরিচিত এক মুখ, যাঁর অভিনয় ও স্মৃতি দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

শ্রীনগরশ্রীনগর সিরাজদিখানসিরাজদিখান টংগিবাড়ীটংগিবাড়ী সদরসদর গজারিয়াগজারিয়া লৌহজংলৌহজং মুন্সিগঞ্জ