ভাদ্রমাসে বিক্রমপুরের বহু বছরের রীতি ঘরে ঘরে তালের পিঠা
মুন্সিগঞ্জ, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
ভাদ্রমাস মানেই প্রকৃতিতে তাল পাকার মৌসুম। আর পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লেই যেন পুরোনো এক ঐতিহ্য ফিরে আসে বিক্রমপুরের গ্রামবাংলায়। বাড়ির উঠানে বসে তাল কুড়ানো, তাল থেকে রস বের করা, চালের গুঁড়া ও নারকেলের সঙ্গে মিশিয়ে পিঠা বানানো—সব মিলিয়ে ভাদ্র মাসে জমে ওঠে এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ।
বিক্রমপুরের বহু বছরের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে তালের পিঠা। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা আর নানা ধরনের আধুনিক খাবারের ভিড়েও এখানকার অনেক পরিবার এখনো ভাদ্র মাসে ঘরে তালের পিঠা তৈরি করে থাকে। কারও কাছে এটি প্রিয় খাবার, কারও কাছে আবার শৈশবের স্মৃতি জাগানো এক আবেগের নাম।
ভাদ্রের শুরুতেই গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির তালগাছগুলোতে দেখা মেলে পাকা তালের। গাছ থেকে পাকা তাল নামানোর পর শুরু হয় পিঠা তৈরির প্রস্তুতি। তাল ছাড়িয়ে এর শাঁস বের করে ভালোভাবে চটকে নেওয়া হয়। এরপর চালের গুঁড়া, নারকেল, চিনি বা গুড়সহ বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় পিঠার মিশ্রণ। কেউ তালের পিঠা ভাপে তৈরি করেন, আবার কেউ তেলে ভেজে নেন।
বিক্রমপুরের প্রবীণদের কাছে এই পিঠার গল্প আরও পুরোনো। তাঁদের ভাষায়, একসময় ভাদ্র মাসে তালের পিঠা তৈরি ছিল অনেকটা পারিবারিক আয়োজনের মতো। বাড়ির নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর—সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকত। পাকা তাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে পিঠা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াতেই থাকত আনন্দ আর উৎসবের আবহ।
বাড়ির উঠানে পিঠা তৈরির সময় পাশের বাড়ির স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরাও এসে জড়ো হতেন। গরম গরম তালের পিঠা, সঙ্গে চা কিংবা খেজুরের গুড়—বিক্রমপুরের গ্রামীণ জীবনে এমন দৃশ্য ছিল একসময় বেশ পরিচিত।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে জীবনযাত্রা। ব্যস্ততা বেড়েছে, কমেছে উঠানে বসে পিঠা তৈরির আয়োজন। বাজারে এখন নানা ধরনের তৈরি খাবার সহজেই পাওয়া যায়। তারপরও ভাদ্র এলেই বিক্রমপুরের অনেক পরিবারে ফিরে আসে সেই চেনা আয়োজন।
স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “ছোটবেলায় ভাদ্র মাস আসলেই তালের পিঠার জন্য অপেক্ষা করতাম। বাড়ির সবাই মিলে তাল পরিষ্কার করতাম। এখন সময় বদলেছে, কিন্তু তালের পিঠা খেলে সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে।”
শুধু স্বাদ নয়, তালের পিঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিক্রমপুরের কৃষি ও ঋতুভিত্তিক জীবনযাত্রার ইতিহাসও। একসময় মৌসুমি ফলকে ঘিরেই গ্রামীণ মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে তৈরি হতো নানা পদ। তাল ছিল তার অন্যতম। পাকা তাল দিয়ে পিঠা, পায়েসসহ বিভিন্ন খাবার তৈরির রীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে।
বিক্রমপুরের স্থানীয় সংস্কৃতির গবেষকদের মতে, কোনো অঞ্চলের খাবার শুধু খাবার নয়; এর সঙ্গে সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, ঋতু, কৃষি ও পারিবারিক সম্পর্কের ইতিহাসও জড়িয়ে থাকে। তাই তালের পিঠার মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো সংরক্ষণ করা মানে একটি অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতিকে ধরে রাখা।
ভাদ্রের বাতাসে যখন পাকা তালের গন্ধ ভেসে আসে, তখন বিক্রমপুরের অনেক ঘরেই যেন ফিরে আসে হারিয়ে যেতে বসা সেই পুরোনো দিনের আবহ। মাটির চুলায় পিঠা তৈরির শব্দ, গরম পিঠার ধোঁয়া আর পরিবারের সদস্যদের হাসি-আড্ডায় প্রাণ ফিরে পায় গ্রামীণ উঠান।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও, ভাদ্রমাসে তালের পিঠার সেই পুরোনো স্বাদ আর স্মৃতি এখনো বিক্রমপুরের মানুষের কাছে আপন। তাই তালের পিঠা শুধু একটি মৌসুমি খাবার নয়—এটি বিক্রমপুরের লোকজ ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন আর শেকড়ের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার এক মিষ্টি উপলক্ষ।









