এক্সপ্লেইনার: ইদ্রাকপুর কেল্লায় বাণিজ্যিক ছবি/ভিডিও শ্যুটে কেন টাকা লাগবে? কোথায় যাবে টাকা?
মুন্সিগঞ্জ, ৬ মে ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
মুন্সিগঞ্জের ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লায় ‘বাণিজ্যিক’ উদ্দেশ্যে ছবি তুললেই দিতে হবে ২০ টাকা। এছাড়া ৩০ মিনিট ও ১ ঘন্টার জন্য ফটো/ভিডিও শ্যুট করলে দিতে হবে যথাক্রমে ১ হাজার ৭২৫ ও ৩ হাজার ৪৫০ টাকা।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। অনেকেই এই নির্দেশনা নিয়ে নিজেদের মন্তব্য জানান।
আমার বিক্রমপুর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
মূলত, টাকা আদায়ের নির্দেশনাটি সরকারের পক্ষ থেকেই। ২০১৯ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত ‘প্রত্নস্থলে চিত্রায়ন ও আলোকচিত্র গ্রহণ নির্দেশিকা-২০১৯’ রয়েছে। সেখানে ইদ্রাকপুর কেল্লা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভাড়া ও জামানতের কথা বলা আছে। দীর্ঘদিন এ বিষয়টির প্রয়োগ না থাকাতে অনেকের কাছে বিষয়টি নতুন মনে হয়েছে। তাছাড়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কারণেই বিষয়টি সকলের সামনে এসেছে।
উল্লেখিত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় বলা হয়, বৃহত্তর জনগণের মধ্যে প্রত্নস্থল ও পুরাকীর্তির প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি করা, প্রত্নস্থল ও পুরাকীর্তির চিত্রায়ন এবং আলোকচিত্র গ্রহণের বিদ্যমান পদ্ধতি সহজীকরণ এবং ফি’র বিনিময়ে চিত্রায়ন ও আলোকচিত্র গ্রহণের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এ নির্দেশিকার উদ্দেশ্য।
আবেদনের নিয়মাবলিতে বলা হয়, আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে চিত্রায়ন বা আলোকচিত্র গ্রহণের অনুমোদন নিতে পারবেন- ক. আগ্রহী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে। খ. চিত্রায়ন বা আলোকচিত্র (স্থিরচিত্র) গ্রহণ করতে হলে কমপক্ষে ১০ কার্যদিবস পূর্বে প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে। স্থানীয়ভাবে আবেদন করলে কমপক্ষে ১৪ কার্যদিবস পূর্বে আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পরিচালক কার্যালয়/কাস্টোডিয়ান কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাস্টোডিয়ান কার্যালয় আঞ্চলিক কার্যালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করে আবেদনটি মতামতসহ সরাসরি প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করবে। আঞ্চলিক কার্যালয় মূল আবেদন মতামতসহ অধিদপ্তরে প্রেরণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লিখিতভাবে অবহিত রাখবে।
আরও বলা হয়, অনুমোদন প্রদান আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্র প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছার পর মহাপরিচালক তা পরীক্ষা করে অনুমোদন প্রদান করবেন (ক্ষেত্রবিশেষে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন গ্রহণ করবেন।)
ভাড়া জমাপ্রদানের পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারীর আবেদন অনুমোদিত হলে ভাড়াগ্রহণকারী কর্তৃক সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া ও জামানতের অর্থ ‘চিত্রায়ন ও আলোকচিত্র তহবিল (সংশ্লিষ্ট জাদুঘর/সাইটের নাম), প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর’ এর অনুকূলে পৃথক দু’টি ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার’ এর মাধ্যমে কাস্টোডিয়ান কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। নগদ বা চেকের মাধ্যমে কোন অর্থ গ্রহণ করা হবে না। ফি জমা না দেয়া পর্যন্ত চিত্রায়ন বা আলোকচিত্র গ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে না।
নিয়ম বা শর্তে হিসেবে বলা হয়, প্রত্নস্থলে কোন প্রকার গর্ত করা যাবে না বা বাগান নষ্ট করা যাবে না। পুরাকীর্তি বা প্রত্নস্থলে কোন প্রকার সভা, সমাবেশ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানমূলক কোন অনুষ্ঠান করা যাবে না। প্রত্নস্থলে কোন প্রকার ধুমপান করা যাবে না বা কোন ধরণের মাদকদ্রব্য গ্রহণ বা বহন করা যাবে না। চিত্রায়ন, ভিডিওচিত্র বা আলোকচিত্র গ্রহণকালে পুরাকীর্তি বা প্রত্নস্থাপনার কোন ধরণের বিকৃত রূপ ধারণ করা যাবে না। প্রত্নস্থলে ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলা পরিচালনা করা যাবে না।
এছাড়া ওই নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, চিত্রায়ন ও আলোকচিত্র গ্রহণ বাবদ প্রাপ্ত সমুদয় অর্থের পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট সংশ্লিষ্ট কাস্টোডিয়ান এর তত্ত্বাবধানে ‘তফসিলভুক্ত সরকারি ব্যাংক’ এর নিকটতম শাখায় জমা দিতে হবে। আবেদনকারীর কার্যক্রম শেষে সরকারের প্রচলিত আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণ পূর্বক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমাকৃত পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট’ এর বিপরীতে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বরাদ্দ বাতিলের আবেদন করা হলে কর্তনযোগ্য অর্থ ব্যতিরেকে অবশিষ্ট টাকা আবেদনকারীকে চেকের মাধ্যমে ফেরত দেয়া হবে।
বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য ভাড়া ও জামানতের হার হিসেবে বলা হয়, আলোকচিত্র গ্রহণ ও চিত্রায়নের জন্য নিম্নোক্ত স্থানসমূহ: লালবাগ দূর্গ, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, পানাম সিটি, ইদ্রাকপুর দূর্গ, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, তাজহাট জমিদার বাড়ি (রংপুর জাদুঘর), ময়নামতি শালবন বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ। প্রস্তাবিত ভাড়ার হার- প্রতি ঘন্টা ৩ হাজার টাকা, প্রস্তাবিত জামানতের হার, প্রতি ঘন্টা ৬ হাজার টাকা।রাত্রিকালীন আলোকচিত্র গ্রহণ ও চিত্রায়নে দিনের দ্বিগুন হারে ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। তবে তা কোনক্রমেই রাত ১০টা অতিক্রম করবে না।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এ নির্দেশিকাটি জারি করেন।
ইদ্রাকপুর কেল্লা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারির বিষয়টি জানতে চাইলে নিশ্চিত করেছেন কেল্লার ইনচার্জ মো. ওমর ফারুক।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছবি/ভিডিও ধারণে সরকার নির্ধারিত ফি এখন থেকে আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দর্শনার্থীদের টিকিট সংগ্রহ করে নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে দুর্গ ও জাদুঘর পরিদর্শন করতে হবে। শৃঙ্খলা ও স্থাপনার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, দেশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা। বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট মূল্য ৩০০ টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিয়ে, প্রি-ওয়েডিং, পোস্ট-ওয়েডিং, কাপল বা পণ্য ফটোশুট, টিকটক, মিউজিক ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের চিত্রধারণের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আধা ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ৭২৫ টাকা এবং এক ঘণ্টার জন্য ৩ হাজার ৪৫০ টাকা (ভ্যাটসহ) ফি দিতে হবে।
চিত্রধারণের ক্ষেত্রে অন্তত দুই দিন আগে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে এবং ৬ হাজার টাকা জামানত প্রদান সাপেক্ষে অনুমতি নিতে হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।





