আধুনিক সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র মুন্সিগঞ্জের গর্ব শিল্পী হাবিব ওয়াহিদ
মুন্সিগঞ্জ, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক (আমার বিক্রমপুর)
বাংলা গানের চিরায়ত লোকজ সুরকে আধুনিক বিশ্বের দরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন—আমাদের সংগীতের জাদুকর হাবিব ওয়াহিদ। শুধু দেশজুড়ে নয়, তাঁর এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে জড়িয়ে আছে পদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী বিধৌত পুণ্যভূমি মুন্সিগঞ্জের নাম।
ঢাকার বুকে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও, হাবিব ওয়াহিদের নাড়ির টান আর শিকড় লুকিয়ে আছে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার দক্ষিণ পাইকসা গ্রামে। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া এই মাটির সুর আর ঐতিহ্যকেই তিনি বিশ্বমঞ্চে বিলিয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তাই তো মুন্সিগঞ্জবাসী তাঁকে নিয়ে গর্ব করে বুক ফোলান।
হাবিব ওয়াহিদের সংগীতে আসার গল্পটা অনেকটাই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। তাঁর বাবা, বাংলাদেশের পপ সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ ফেরদৌস ওয়াহিদও মুন্সিগঞ্জেরই কৃতি সন্তান। বাবার হাত ধরেই সুরের ভুবনে হাবিবের পদার্পণ। তবে হাবিব কেবল বাবার ধারাকে অনুকরণ করেননি, বরং নিজের মেধা আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (যুক্তরাজ্যের স্কুল অব অডিও ইঞ্জিনিয়ারিং) কাজে লাগিয়ে বাংলা সংগীতের সম্পূর্ণ খোলনলচে বদলে দিয়েছেন।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন বাংলা অডিও ইন্ডাস্ট্রি একঘেয়েমিতে ভুগছিল, ঠিক তখনই ২০০৩ সালে হাবিব ওয়াহিদের হাত ধরে আসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। লোকসংগীতের কালজায়ী সুরের সাথে ওয়েস্টার্ন টেকনো, ইলেকট্রনিক্স ও শহুরে বিটের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি উপহার দেন ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামটি। এরপর ‘মায়া’, ‘শোনো’, ‘পাঞ্জাবী ওয়ালা’র মতো একের পর এক সুপারহিট অ্যালবাম ও গান দিয়ে তিনি তরুণ প্রজন্মকে রি-মিক্স ও ফিউশন ঘরানার গানে মায়াবদ্ধ করেন। হাবিবের সুরের ছোঁয়ায় গ্রামীণ লোকগীতি শহুরে ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে ডিস্কো থেক—সব জায়গায় একচেটিয়া রাজত্ব শুরু করে।
অ্যালবামের গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্রে আবহ আবহ তৈরি এবং প্লেব্যাকেও হাবিব ওয়াহিদ দেখিয়েছেন তাঁর অনন্য মুন্সিয়ানা। ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ চলচ্চিত্রের ‘দ্বিধা’ কিংবা ‘খোঁজ দ্য সার্চ’র গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়। পরবর্তীতে একক গান ও মিউজিক ভিডিওর যুগেও তিনি ‘মন জোনাকী’ বা ‘ঝড়’ এর মতো গান দিয়ে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন শীর্ষস্থানে। গায়ক হিসেবে তো বটেই, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর সৃষ্টিশীলতা অতুলনীয়।
ব্যস্ততার কারণে ঢাকার বাসিন্দা হলেও মুন্সিগঞ্জের প্রতি হাবিব ও তাঁর পরিবারের টান কখনো কমেনি। বিশেষ করে তাঁর বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদ জীবনের একটা বড় সময় নিজ গ্রাম শ্রীনগরে কাটিয়েছেন। বাবার মতোই হাবিবও সুযোগ পেলেই ছোটেন শিকড়ের টানে। বিগত দিনগুলোতে মুন্সিগঞ্জের মাটিতে তাঁর পরিবেশনা স্থানীয় মানুষের মাঝে তৈরি করেছে অভূতপূর্ব উন্মাদনা। নিজ জেলায় কনসার্ট করতে গিয়ে হাবিব সবসময়ই আবেগ আপ্লুত হয়েছেন এবং মুন্সিগঞ্জের মানুষের ভালোবাসাকে তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আজকের আধুনিক বাংলা গান যেভাবে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন হাবিব ওয়াহিদ। মুন্সিগঞ্জের এই কৃতি সন্তান তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, শিকড়কে বুকে ধারণ করেও কীভাবে বিশ্বমানের সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি শুধু মুন্সিগঞ্জের গর্ব নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের অহংকার।
আধুনিক সংগীতের আকাশে এই উজ্জ্বল নক্ষত্র আরও বহু বছর তাঁর সুরের আলো ছড়িয়ে যাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা কোটি শ্রোতার।








